নির্জন আগ্নেয় দ্বীপে গরুদের অবিশ্বাস্য বিবর্তন!
প্রকৃতি কখনও কখনও এমন গল্প লিখে, যা কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়। ভারত মহাসাগরের দক্ষিণে অবস্থিত নির্জন আগ্নেয় দ্বীপ আমস্টারডমে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা তারই উদাহরণ। মাত্র পাঁচটি গরু থেকে শুরু হয়েছিল যে গল্প, কয়েক দশকের মধ্যে তা পৌঁছে যায় প্রায় দু’হাজার সদস্যের বিশাল এক বন্য গরুর দলে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৮৭১ সালে। ফরাসি নাগরিক হিউরটিন আমস্টারডম দ্বীপে বসতি গড়ার স্বপ্ন নিয়ে পৌঁছেছিলেন। সঙ্গে ছিল একটি ষাঁড়, দু’টি গরু এবং দু’টি বাছুর। কিন্তু অনুর্বর জমি, কঠিন পরিবেশ ও নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত দ্বীপ ছেড়ে চলে যান তিনি, তবে গরুগুলিকে সেখানেই রেখে যান।
বহু বছর পরে বিজ্ঞানীরা যখন দ্বীপটিতে পৌঁছন, তখন তাঁদের ধারণা ছিল ওই প্রাণীগুলির অস্তিত্ব হয়তো আর নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাঁচটি গরুর বংশবিস্তার হয়ে তখন প্রায় দু’হাজারে পৌঁছেছে। গোটা দ্বীপ জুড়ে বিচরণ করছে তাদের বংশধরেরা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ছিল, বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকেও তারা শুধু বেঁচেই থাকেনি, বরং সফলভাবে প্রজননও করেছে। সাধারণত দীর্ঘদিনের আন্তঃপ্রজননের ফলে প্রাণীদের মধ্যে নানা জিনগত সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু আমস্টারডমের গরুগুলির ক্ষেত্রে সেই ধরনের সমস্যা প্রায় অনুপস্থিত ছিল।
বিজ্ঞানীরা ১৮টি গরুর ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে জানতে পারেন, এই গরুগুলির পূর্বপুরুষ ছিল ইউরোপীয় জার্সি ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জেবু প্রজাতির সংমিশ্রণ। এই মিশ্র বংশধারার কারণে তারা বিশেষ কিছু সুবিধা পেয়েছিল। জার্সি গরুর উচ্চ প্রজনন ক্ষমতা এবং জেবুর তাপ ও পরজীবী প্রতিরোধের ক্ষমতা একসঙ্গে কাজ করেছিল তাদের শরীরে। বিজ্ঞানীরা একে “হাইব্রিড ভিগর” বলে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, দীর্ঘদিনের কঠোর পরিবেশ তাদের আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় গঠনে পরিবর্তন এনেছিল। গৃহপালিত স্বভাব প্রায় হারিয়ে তারা বন্য প্রাণীর মতো সতর্ক ও আত্মরক্ষামূলক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত কিছু জিনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়, যা তাদের মানসিক চাপ মোকাবিলার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
তবে এই বিস্ময়কর অভিযোজনের গল্পের শেষটা সুখের হয়নি।
দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রের উপর গরুগুলির প্রভাব ক্রমশ ক্ষতিকর হয়ে উঠছিল। তারা বিপুল পরিমাণে স্থানীয় উদ্ভিদ খেয়ে ফেলছিল। বিশেষ করে বিরল ফাইলিকা আর্বোরিয়া গাছের সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। এই গাছগুলির উপর নির্ভর করে বাসা বাঁধত বিপন্ন আলবাট্রস পাখি। ফলে পাখিদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্স সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৮৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে গরুগুলিকে নির্মূল করা হয়। আজ আর সেই বিস্ময়কর গবাদি পশুর দল নেই। তবে তাদের কিছু ডিএনএ নমুনা ও হাড় গবেষণার জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজনের এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে আমস্টারডম দ্বীপের সেই গরুগুলি— যারা মাত্র পাঁচ থেকে বেড়ে একসময় দখল করেছিল পুরো দ্বীপ।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?