পশ্চিম এশিয়ায় ‘এফ-৩৫ বনাম এফ-৩৫’!
পশ্চিম এশিয়ার আকাশে নয়া অশনি সংকেত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্কের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আঙ্কারাকে অত্যাধুনিক ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমতি দিতে পারেন—এমন ইঙ্গিত মিলতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে কূটনৈতিক মহলে। কারণ, এফ-৩৫ ইজরায়েলেরও প্রধান যুদ্ধবিমান। ফলে ট্রাম্প সত্যিই সিদ্ধান্ত নিলে দেখা যেতে পারে নজিরবিহীন দৃশ্য—আমেরিকারই তৈরি লড়াকু জেটের মুখোমুখি আমেরিকারই তৈরি জেট!
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক বদলের ইঙ্গিত
২৫ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এর্দোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। সেই বৈঠকের পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, আঙ্কারার উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা ভাবছেন তিনি। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে এফ-৩৫ কেনার পথ খুলে যাবে তুরস্কের সামনে। আর তাতেই চাপে ইজরায়েল, কারণ তুর্কি সেনা তখন সহজেই ছোট্ট ইহুদি রাষ্ট্রটির দিকে নিশানা তাক করতে পারবে।
তুরস্ক ১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোর সদস্য এবং আমেরিকার অন্যতম সামরিক সহযোগী। তবে ২০১৯ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনায় রুষ্ট হয় ওয়াশিংটন এবং তুরস্কের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপায়। তাতেই বন্ধ হয়ে যায় এফ-৩৫ কেনার পথ।
ইজরায়েল-তুরস্ক দ্বন্দ্বে নতুন আগুন
ইজরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই খারাপ। এর্দোয়ান প্রকাশ্যে ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না এবং হামাস নেতাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও আছে আঙ্কারার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি হামাসের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে কাতারের দোহায় ইজরায়েলের বিমান হামলার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার আঙ্কারাই হতে পারে ইজরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য।
এফ-৩৫-এর অন্যতম শক্তি তার ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তি, যা তাকে শত্রুর রাডারের চোখে প্রায় অদৃশ্য করে রাখে। দূর দেশ থেকে বোমাবর্ষণ করে নির্বিঘ্নে ঘাঁটিতে ফিরে আসার ক্ষমতার জন্য এই বিমান ইজরায়েলের সবচেয়ে ভরসাযোগ্য হাতিয়ার।
আঞ্চলিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের আশঙ্কা
এফ-৩৫ হাতে পেলে তুরস্ক সিরিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা সাজাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এমনকি আরব দেশগুলিও ‘ইসলামিক ফোর্স’ বা ‘আরব ন্যাটো’-র মতো জোট গঠনের পক্ষে যেতে পারে। এতে আঞ্চলিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
তুরস্কের আগ্রাসনের আশঙ্কায় উদ্বেগে রয়েছে গ্রিস ও সাইপ্রাসও। একসময় অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে থাকা এই দুই দেশ স্বাধীন হলেও, আঙ্কারা এখনও তাদের ভূখণ্ডের দাবিতে অনড়। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে এর্দোয়ান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কূটনৈতিক সমীকরণে জটিলতা
‘দ্য ইউরেশিয়ান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তুরস্ক অন্তত ৪০টি এফ-৩৫ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ৭০টি ভাইপার জেটের চুক্তিও হতে পারে। বর্তমানে তাদের হাতে রয়েছে ৭৯টি এফ-১৬, যেগুলি আধুনিকীকরণের পরিকল্পনাও চলছে।
অন্যদিকে, ইজরায়েলের কাছে এখন ৪৫টি এফ-৩৫ আছে, যা আগামী বছরে ৫০ হবে এবং ২০২৮ সালের মধ্যে আরও ২৫টি যোগ হবে। গ্রিসও ২০২৮ সালের মধ্যে ২০টি এফ-৩৫ পাবে। ফলে একাধিক দেশ একই বিমান ব্যবহার করবে—যা ভবিষ্যতের সংঘাতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প কি সত্যিই যাবেন এত দূর?
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ট্রাম্পের পক্ষে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তোলা সহজ নয়। ইজরায়েল আমেরিকার সবচেয়ে বড় কৌশলগত মিত্র এবং তার শত্রুর হাতে উন্নত অস্ত্র তুলে দেওয়ার নজির নেই। তাছাড়া গ্রিসও ন্যাটোর সদস্য, ফলে তারা চাপে ফেলতে পারে আমেরিকাকে।
শর্তও দিয়েছেন ট্রাম্প—তুরস্ককে রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটির পক্ষে তা সহজ নয়।
তবু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ছ’বছর পর এর্দোয়ানের ওয়াশিংটন সফর এবং ট্রাম্পের অস্থির সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বভাব—সব মিলিয়ে এখন নজর একটাই প্রশ্নে: পশ্চিম এশিয়ার আকাশে কি সত্যিই দেখা যাবে ‘এফ-৩৫ বনাম এফ-৩৫’-এর লড়াই?