নেটোর দরজায় ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র মোতায়েন
নতুন বছর শুরু হতে না হতেই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে উত্তেজনা বেড়েছে। দক্ষিণ ইউরোপের বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়ায় চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এফকে-৩ মোতায়েন করার খবরে আমেরিকাসহ নেটোভুক্ত দেশগুলির মধ্যে অস্বস্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট নেটোর নাকের ডগায় চীনের মারণাস্ত্র স্থাপন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুন দিশায় নিয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চীনের এফকে-৩: এক বিপজ্জনক অস্ত্র
সার্বিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, চীনের এফকে-৩ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের দেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই সিস্টেমটি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং শত্রুর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করতে পারে। এটি একসঙ্গে ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছ’টি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) হাতে থাকা এইচকিউ-২২-এর রপ্তানিযোগ্য সংস্করণ হিসেবে পরিচিত এফকে-৩, যা রাশিয়ার এস-৩০০-এর সঙ্গে তুলনীয়।

চীনের অস্ত্র সরবরাহে পশ্চিমি বিশ্বের উদ্বেগ
২০২২ সালে চীনের পরিবহণ বিমান ওয়াই-২০-তে করে সার্বিয়ায় পৌঁছে এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এটি ছিল ইউরোপে চীনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র রপ্তানি। চীনের পক্ষ থেকে এই ব্যবস্থা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত উন্নত বলে দাবি করা হয়েছে। এর অ্যান্টি-জ্যামিং প্রযুক্তি এবং কৌণিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার শত্রু পক্ষের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করতে অত্যন্ত কার্যকর।
আমেরিকার উদ্বেগ এবং পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া
সার্বিয়ায় এই মারণাস্ত্র মোতায়েনের ফলে নেটোভুক্ত দেশগুলির প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর আগে বেলগ্রেডকে এই চুক্তি থেকে সরে আসতে বলেছিল। কিন্তু সার্বিয়া সেই হুমকিকে আমল না দিয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বিয়ার এফকে-৩ ব্যবহারের ফলে তাদের রাডার সিস্টেম নেটোর লড়াকু বিমানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হবে, যা ভবিষ্যতে যুদ্ধের সময়ে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
চীনের লক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এর প্রভাব
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইতিমধ্যেই বর্ষশেষের ভাষণে তাইওয়ান নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। এদিকে, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন। ট্রাম্প নেটো ত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং ইউরোপীয় দেশগুলির প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে সার্বিয়ায় চীনের অস্ত্র মোতায়েন পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে, বিশেষ করে ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানির মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
সামরিক আধুনিকীকরণে চীনের অগ্রগতি
পেন্টাগনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের সামরিক আধুনিকীকরণ বিশ্ব প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে। চীনের অনেক অস্ত্র এখন আমেরিকার সমতুল্য। সার্বিয়ার সঙ্গে চীনের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি বেজিংয়ের বিশ্ব জুড়ে প্রভাব বাড়ানোর কৌশলেরই অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এফকে-৩ চীনের অস্ত্র বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
উপসংহার
চীনের এফকে-৩ মারণাস্ত্রের মোতায়েন শুধু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, এটি বৈশ্বিক রাজনীতির জটিলতাকেও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। নেটো এবং আমেরিকার গলায় এই নতুন চাপ তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা সময়ই বলবে।