তরল সোনা’র নেশায় ক্ষমতার খেলাঘর!
ভেনেজ়ুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর আবার নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে একটি পুরনো অভিযোগ—তেলের লোভে দেশ ধ্বংস করার খেলায় আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাস। মাদক বা সন্ত্রাস দমনের যুক্তি সামনে রেখে কারাকাসে ঢুকে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করার পরই স্পষ্ট হয়েছে, ভেনেজ়ুয়েলার বিপুল খনিজ তেলই আসলে ওয়াশিংটনের আসল লক্ষ্য। এই ঘটনাই মনে করিয়ে দিচ্ছে, অতীতেও ‘তরল সোনা’র দখল নিতে একের পর এক দেশে ক্ষমতার পালাবদল, গৃহযুদ্ধ বা সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে নাম লিখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই কাহিনির শুরু বহু আগেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব বুঝে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ দেশগুলির দিকে নজর দেয় আমেরিকা। ১৯৫০-এর দশকে ইরান ছিল তার প্রথম বড় উদাহরণ। সেখানে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ মোসাদ্দেক তেলকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয় ব্রিটিশ ও মার্কিন তেল সংস্থাগুলি। ফলাফল—সিআইএ ও ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থার যৌথ ষড়যন্ত্রে ১৯৫৩ সালে সেনা অভ্যুত্থান, মোসাদ্দেকের পতন এবং তেলের উপর পশ্চিমি সংস্থার ফের নিয়ন্ত্রণ।
এর পরের অধ্যায় ইরাক। ২০০০ সালে সে দেশের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন ঘোষণা করেন, তেল বিক্রি হবে ডলারের বদলে ইউরোয়। এই সিদ্ধান্তই কার্যত তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। তিন বছরের মাথায় ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’-এর অভিযোগ তুলে ইরাকে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে প্রমাণ হয়, সেই অস্ত্রের অস্তিত্বই ছিল না। কিন্তু তত দিনে সাদ্দাম ক্ষমতাচ্যুত, দেশ বিধ্বস্ত, আর ইরাকের তেলক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে একাধিক মার্কিন সংস্থা।
লিবিয়ার গল্প আরও ভয়াবহ। সেনাশাসক মুয়াম্মর গদ্দাফি ডলারের বাইরে গিয়ে তেলের বাণিজ্য এবং আফ্রিকার জন্য আলাদা মুদ্রার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০১১ সালে মার্কিন মদতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের হাতে নৃশংস ভাবে নিহত হন গদ্দাফি। তাঁর মৃত্যুর পর আজও লিবিয়া স্থিতিশীল হয়নি। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী তেল লুট করে কালোবাজারে বিক্রি করছে—যার বড় অংশ ঘুরপথে পৌঁছচ্ছে পশ্চিমি দেশগুলিতেই।
এই তালিকায় ইরানও রয়েছে, যদিও সেখানে সরাসরি ক্ষমতা বদল সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তেলের বাজারে তারা স্বাধীন ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
এখন সেই একই ছায়া পড়ছে ভেনেজ়ুয়েলার উপর। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলভান্ডার থাকা এই দেশকে ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় স্পষ্ট—কারাকাস থেকে কোটি কোটি ব্যারেল তেল নেওয়া হবে, আর সেই বিক্রির টাকার নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমেরিকার হাতেই।
ইরান থেকে ইরাক, লিবিয়া থেকে ভেনেজ়ুয়েলা—একটি সুতোয় গাঁথা এই গল্পে বারবারই ফিরে আসে তেলের লোভ। সমালোচকদের মতে, বিশ্ব রাজনীতির এই ‘তরল সোনা’র খেলায় আমেরিকা বরাবরই প্রথম সারির খেলোয়াড়, আর তার মূল্য চুকিয়েছে বহু দেশ ও তাদের সাধারণ মানুষ।