‘ইন্ডিয়ান আইডল’ থেকে এআর রহমানের গায়িকা— দীপালী সহায়ের ১৯ বছরের লড়াই
বিহারের পটনার মেয়ে দীপালী সহায়। ২০০৭ সালে ‘ইন্ডিয়ান আইডল সিজ়ন ৩’-এর প্রতিযোগী হিসেবে প্রথমবার দর্শকের নজরে আসেন। এরপর সঞ্চালনা, অভিনয়, ভোজপুরি গান— নানা পথ ঘুরে অবশেষে প্রায় ১৯ বছর পর বলিউডে বড় ব্রেক। ইমতিয়াজ় আলির নতুন ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আয়ুঙ্গা’-র ‘তেরে পাস ম্যায়’ গানটি এআর রহমানের সুরে গেয়ে এখন প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দু তিনি। কিন্তু এই সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না।
দীপালীর কথায়, তিনি কখনও সাফল্যের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করেননি। বরং প্রতিদিন নিজেকে আরও ভাল শিল্পী করে তোলার চেষ্টাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তাই অনেকেই যাকে ১৯ বছরের সংগ্রাম বলছেন, তিনি সেটিকে শেখার সময় হিসেবেই দেখেন। তাঁর বিশ্বাস, এই গান গাওয়ার মতো পরিণত কণ্ঠস্বর ১৮ বছর বয়সে তাঁর ছিল না। তাই সুযোগ এসেছে ঠিক সময়েই।
‘ইন্ডিয়ান আইডল’ থেকে বিদায়ের পরেও সঙ্গীত ছাড়েননি দীপালী। কিন্তু এক সময় ভয়াবহ ধাক্কা আসে জীবনে। একটি অনুষ্ঠানে দীর্ঘ সময় সঞ্চালনা করার ফলে তাঁর স্বরযন্ত্রে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি আর কোনও দিন গান গাইতে পারবেন না, এমনকি স্বাভাবিক ভাবে কথাও বলতে নাও পারেন।
এই খবর শুনে ভয় পেলেও সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েননি তিনি। অভিনয়ে মন দেন, পরে চলচ্চিত্র পরিচালনা শেখার জন্য ভর্তি হন এফটিআইআই-এ। তবে গান তাঁর মন থেকে কখনও হারিয়ে যায়নি। ২০১৪ সালে চিত্রগ্রাহক বাবা আজ়মির উৎসাহেই আবার ধীরে ধীরে রেওয়াজ শুরু করেন। প্রায় দু’বছর ধরে নিজের কণ্ঠকে নতুন করে গড়ে তোলেন তিনি।
দীপালীর পরিবারও তাঁর পাশে থেকেছে প্রতিটি মুহূর্তে। পুলিশ পরিবারে বড় হওয়া এই শিল্পী জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁকে স্বাধীনভাবে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করার সাহস জুগিয়েছেন মা-বাবা।
সমাজমাধ্যমে নিয়মিত গান প্রকাশ করতেন দীপালী। বিশেষ করে তাঁর ভোজপুরি গানের সিরিজ় বেশ জনপ্রিয় হয়। অনেকেই তাঁকে বলেছিলেন, ভোজপুরি গান গাইলে বলিউডে সুযোগ পাওয়া কঠিন হবে। কিন্তু তিনি সেই সমালোচনায় কান দেননি। বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির গান গেয়েই এগিয়ে গিয়েছেন। পরে সেই ভোজপুরি গানই পৌঁছে যায় এআর রহমানের কাছে।
আরও একটি কাকতালীয় ঘটনা দীপালীর জীবনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর এবং রহমানের জন্মদিন একই দিনে— ৬ জানুয়ারি। সেই দিনই রহমানের অফিস থেকে তাঁর কাছে ফোন আসে। এরপর চেন্নাইয়ে গিয়ে কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি চলে। বহুবার রিহার্সাল ও সংশোধনের পর অবশেষে রেকর্ড করা হয় ‘তেরে পাস ম্যায়’।
রহমান সম্পর্কে দীপালীর অভিজ্ঞতাও আলাদা। তাঁর কথায়, রহমান খুব কম কথা বলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত নিখুঁত কাজের পক্ষপাতী। কোনও শিল্পীকে কখনও ছোট করেন না। বরং তাঁর প্রতিভার উপর আস্থা রেখেই কাজ করান। গান রেকর্ডিংয়ের পর রহমান নিজেই তাঁকে বলেন, “দীপালী, গানটা দারুণ গেয়েছ।” সেই প্রশংসাই আজও তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
ইমতিয়াজ় আলির সঙ্গেও কাজের অভিজ্ঞতা স্মরণীয়। ছবির একটি আবেগঘন দৃশ্যে গাওয়া অংশে পরিচালক তাঁকে ভালবাসার আবেগ নয়, বরং গভীর অনুভূতির সঙ্গে বক্তব্য রাখার ভঙ্গিতে গাইতে বলেন। সেই সূক্ষ্ম নির্দেশেই গানটির আবহ সম্পূর্ণ বদলে যায়।
ব্যক্তিগত জীবনেও দীপালী পেয়েছেন বড় সমর্থন। তাঁর স্বামী ঐশ্বর্য নিগম, যিনি নিজেও ‘সারেগামাপা’-র বিজয়ী, সব সময় তাঁর পাশে থেকেছেন। দীপালীর কথায়, স্বামী কখনও তাঁকে অর্থ উপার্জনের চাপ দেননি। বরং পেশাদার গায়ক হিসেবে মাইক্রোফোন ব্যবহার থেকে শুরু করে নানা সূক্ষ্ম বিষয় তিনিই শিখিয়েছেন।
১৯ বছর আগে যে মঞ্চে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখান থেকে আজ এআর রহমানের সুরে বলিউডে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন দীপালী সহায়। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, দীর্ঘ অপেক্ষা, সমালোচনা— সব বাধা পেরিয়ে তাঁর এই সফর আজ অনেক নতুন শিল্পীর কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?