ট্যাংরায় হেলে পড়া বহুতল নিয়ে আতঙ্ক
কলকাতার ট্যাংরা এলাকার ক্রিস্টোফার রোডে আবারও এক বহুতল হেলে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এই নির্মীয়মাণ ভবনটি বুধবার সকালে পাশের একটি বাড়ির উপর হেলে পড়ে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বাঘাযতীনের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন দুর্ঘটনা শহরের নির্মাণশৈলী ও কলকাতা পুরসভার ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বাড়িটির নির্মাণ ও দুর্ঘটনার বিবরণ
পাঁচতলা উচ্চতার এই নির্মীয়মাণ ভবনটি প্রোমোটিং সংস্থা মাত্র এক বছরের মধ্যে তৈরি করেছিল। নির্মাণকাজ চলাকালীন ভবনটি পাশের বাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তবে বাড়িটিতে কেউ বসবাস করছিলেন না, ফলে কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। নির্মাণসাইটে কর্মরত রাজমিস্ত্রিরা অক্ষত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নির্মাণের সময় কলকাতা পুরসভার নিয়মাবলী অনুসরণ করা হয়নি। পাশের বাড়িগুলোর সঙ্গে যে ন্যূনতম দূরত্ব রাখা প্রয়োজন, তা মানা হয়নি। এমনকি, নির্মাণকাজ শুরুর আগে এলাকার মাটি পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটি উপেক্ষা করা হয়েছে।
মাটি পরীক্ষা ও নির্মাণ মানের প্রশ্ন
কলকাতার মতো শহরে মাটি পরীক্ষা ছাড়া বহুতল নির্মাণের অনুমতি দেওয়াটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাটি কতটা শক্ত এবং তা কত তলা ভবনের ভার বহন করতে সক্ষম, তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। ক্রিস্টোফার রোডের এই বহুতল নির্মাণে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়রা দাবি করছেন, নির্মাণ সংস্থা এবং পুরসভার বিল্ডিং বিভাগ উভয়ই এই বিষয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। ভবনের ভিত্তি মজবুত না হওয়ায় এবং নির্মাণের সময় যথাযথ নজরদারি না থাকায় এই ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে।
কলকাতা পুরসভার প্রতিক্রিয়া
কলকাতা পুরসভার ৫৮ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়াররা সোমবার ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পুরসভার বিল্ডিং বিভাগে রিপোর্ট জমা পড়েছে এবং কর্মকর্তারা নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছেন।
পুরসভার এক আধিকারিক জানান, “প্রাথমিক রিপোর্টে তেমন উদ্বেগের কিছু পাওয়া যায়নি। তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে আমরা আরও সতর্ক থাকব।” যদিও স্থানীয়দের মধ্যে পুরসভার প্রতি অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, নির্মাণ শুরুর আগে সঠিকভাবে পরিকল্পনা এবং পর্যবেক্ষণ করা হয়নি।
বাঘাযতীনের ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য
ট্যাংরার এই ঘটনা বাঘাযতীনে ঘটে যাওয়া বহুতল হেলে পড়ার ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি মনে করাচ্ছে। বাঘাযতীনে ৯৯ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ভবন হেলে পড়ার পরে স্থানীয় কাউন্সিলর ও মেয়র পরিষদকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে কলকাতা পুরসভার একাংশের মতে, ট্যাংরার ঘটনাটি বাঘাযতীনের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।
এদিকে, মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিধানসভা কেন্দ্রের বন্দর এলাকায় গত বছর বেআইনি বহুতল ভেঙে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনা শহরবাসীর মনে এখনও তাজা। সেই স্মৃতি মাথায় রেখে শহরের প্রতিটি নির্মাণকাজে পুরসভার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন
ট্যাংরা বা বাঘাযতীনের মতো ঘটনা নির্মাণের সময় যথাযথ মান রক্ষা না করার ভয়ঙ্কর পরিণাম। এই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে কঠোর নিয়মকানুন এবং কার্যকর নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতা পুরসভা যদি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে শহরবাসীর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
বাসিন্দাদের আশঙ্কা
ট্যাংরার স্থানীয় বাসিন্দারা বর্তমানে আতঙ্কিত। তারা আশঙ্কা করছেন, এমন আরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শহরে অতি দ্রুত উন্নয়নের দৌড়ে এই ধরনের গাফিলতি বাসিন্দাদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
এখন দেখার বিষয়, কলকাতা পুরসভা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার পর কী ধরনের প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। শহরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর নিয়ম এবং নিয়মিত পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।