গন্ধের শক্তি!
সুগন্ধ শুধু মন ভাল করার উপাদান নয়, বহু যুগ ধরে মানুষের বিশ্বাস ছিল—গন্ধের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে আরোগ্যের শক্তি। প্রাচীন গ্রিক, মিশরীয়, পারসিক সভ্যতা থেকে শুরু করে ভারতীয় মহাকাব্যেও সুগন্ধি ও ভেষজের মাধ্যমে চিকিৎসার নানা উল্লেখ পাওয়া যায়। আজকের দিনে যার পরিচিত নাম ‘অ্যারোমাথেরাপি’, তার শিকড় আসলে বহু পুরনো।
ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণেও সুগন্ধি ভেষজের মাধ্যমে চিকিৎসার গল্প রয়েছে। রাবণের পুত্র ইন্দ্রজিতের শক্তিশেলের আঘাতে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন লক্ষ্মণ। তাঁকে সুস্থ করতে বৈদ্য সুষেণ কয়েকটি বিশেষ ভেষজের কথা বলেছিলেন। সেই ভেষজের গন্ধেই লক্ষ্মণের জ্ঞান ফেরে বলে কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। যদিও এই ঘটনা পৌরাণিক, তবু এটি দেখায় যে প্রাচীন মানুষও উদ্ভিদ ও সুগন্ধির প্রভাব সম্পর্কে ধারণা রাখতেন।
‘অ্যারোমাথেরাপি’ শব্দটির অর্থই হল সুগন্ধের মাধ্যমে চিকিৎসা। গ্রিক শব্দ ‘অ্যারোমা’ অর্থ সুগন্ধ এবং ‘থেরাপি’ অর্থ চিকিৎসা। আধুনিক যুগে এই শব্দটি জনপ্রিয় হয় ফরাসি রসায়নবিদ রেনে-মরিস গ্যাটেফোসের গবেষণার মাধ্যমে। কথিত আছে, ১৯৩৭ সালে পরীক্ষাগারে দুর্ঘটনায় তাঁর হাতে গুরুতর ক্ষত তৈরি হলে তিনি ল্যাভেন্ডার তেল ব্যবহার করেন। পরে তিনি লক্ষ্য করেন, সেই তেল ক্ষত সারাতে সাহায্য করছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সুগন্ধি তেলের চিকিৎসাগত গুণ নিয়ে গবেষণায় উৎসাহিত করে।
তবে সুগন্ধি ও ভেষজের ব্যবহার তার বহু আগেই শুরু হয়েছিল। প্রাচীন ভারতে ঋগ্বেদ, চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতায় বিভিন্ন গাছ, ফুল ও উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। মহাভারতের বিরাট পর্বেও সুগন্ধি তেল ও প্রলেপ তৈরির কথা রয়েছে। মোগল যুগেও রাজপরিবারে গোলাপ, চন্দন ও অন্যান্য ফুলের নির্যাস ব্যবহার করে সৌন্দর্যচর্চা ও মানসিক প্রশান্তির ব্যবস্থা করা হত।
প্রাচীন মিশরেও সুগন্ধির বিশেষ গুরুত্ব ছিল। রানি ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যচর্চায় নানা প্রাকৃতিক উপাদান ও সুগন্ধির ব্যবহার ছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি ফারাও তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কারের সময়ও সংরক্ষণে ব্যবহৃত ভেষজ ও সুগন্ধি উপাদানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।
বর্তমানে অ্যারোমাথেরাপিতে মূলত বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে তৈরি এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করা হয়। ল্যাভেন্ডার, টি ট্রি, পেপারমিন্ট, রোজমেরি বা ইউক্যালিপ্টাসের মতো তেল ঘ্রাণ নেওয়া, ম্যাসাজ, স্নান বা প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয়। অনেকের মতে, এগুলি মানসিক চাপ কমাতে, ঘুমের সমস্যা দূর করতে এবং শরীরের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে অ্যারোমাথেরাপির কার্যকারিতা নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনও বিতর্ক রয়েছে। কিছু গবেষণায় মানসিক প্রশান্তির ক্ষেত্রে এর ইতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হলেও, গুরুতর রোগ নিরাময়ে এর ভূমিকার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যারোমাথেরাপিকে মূল চিকিৎসার বিকল্প না ভেবে সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে দেখা উচিত।
হাজার বছরের পথ পেরিয়ে আজও সুগন্ধ মানুষের জীবনে বিশেষ জায়গা ধরে রেখেছে। কখনও ভেষজের নির্যাসে, কখনও সৌন্দর্যচর্চায়, আবার কখনও মানসিক শান্তির খোঁজে—গন্ধের এই যাত্রা এখনও বহমান।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?