খসড়া ভোটার তালিকায় ঝড়!
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক যখন তুঙ্গে, তখন একের পর এক রাজ্যের খসড়া ভোটার তালিকার পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। মঙ্গলবার কেরল, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ়ের সঙ্গে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সংখ্যাগুলো দেখলে স্পষ্ট— নাম বাদ যাওয়ার নিরিখে অনেক রাজ্যেই পশ্চিমবঙ্গের চেয়েও পরিস্থিতি বেশি গুরুতর।
বামশাসিত কেরলের কথাই ধরা যাক। সেখানে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ২৪ লক্ষ নাম। শতাংশের হিসাবে যা রাজ্যের মোট ভোটারের ৮.৬৫ শতাংশ। তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে এই হার ছিল ৭.৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ, কেরলে বাদ পড়া ভোটারের অনুপাত বাংলার থেকেও বেশি।
তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ছবি ছত্তীসগঢ়ে। বিজেপি-শাসিত এই রাজ্যে খসড়া তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ২৩ লক্ষ ৬৪ হাজার ভোটারের নাম— শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৩ শতাংশ। বাংলার প্রায় দ্বিগুণ। মধ্যপ্রদেশেও ছবিটা খুব আলাদা নয়। সেখানে প্রায় ৪২ লক্ষ ৭৪ হাজার ভোটারের নাম নেই খসড়া তালিকায়, যা মোট ভোটারের ৯.৭৩ শতাংশ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হল— মধ্যপ্রদেশে ‘স্থানান্তরিত’ বা ‘নিখোঁজ’ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ। ছত্তীসগঢ়েও প্রায় একই রকম প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভুয়ো ভোটার নয়, কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযোগ হারানো মানুষজনের নামও বড় সংখ্যায় বাদ পড়েছে।
চমক রয়েছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও। সেখানে মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ১০ হাজার। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ভোটারের নাম খসড়া তালিকায় নেই— যা শতাংশের হিসাবে যথেষ্ট বড় অংশ।
এই পরিসংখ্যান একা নয়। এর আগেই বিজেপি-শাসিত গুজরাতে খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৭৩ লক্ষ ৭০ হাজার ভোটারের নাম— প্রায় ১৪.৫ শতাংশ। তামিলনাড়ুতেও সংখ্যা আরও বেশি। ডিএমকে-শাসিত ওই রাজ্যে বাদ পড়েছে প্রায় ৯৭ লক্ষ নাম, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ। বিজেপি-শাসিত রাজস্থানেও বাদ গিয়েছে প্রায় ৪২ লক্ষ ভোটার— শতাংশের হিসাবে প্রায় ৭.৭ শতাংশ।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, এসআইআর হওয়া বড় রাজ্যগুলির প্রায় সবকটিতেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার হার উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা নিয়ে যে প্রশ্ন ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, সেই একই প্রশ্ন তাহলে গুজরাত, তামিলনাড়ু, ছত্তীসগঢ় বা মধ্যপ্রদেশের ক্ষেত্রেও কেন উঠছে না— সেই বিতর্কও নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে।
যদি ধরে নেওয়া হয় যে নাম বাদ যাওয়ার হার ভুয়ো বা অনুপ্রবেশকারী ভোটারের পরিমাপক, তা হলে একাধিক রাজ্যে সেই ‘সমস্যা’ বাংলার চেয়েও বড় আকারে রয়েছে। আর এখানেই উঠছে মূল প্রশ্ন— এসআইআর কি শুধুই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, না কি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার রং লাগিয়ে দেখা হচ্ছে?
একটা বিষয় পরিষ্কার— খসড়া তালিকা মানেই চূড়ান্ত তালিকা নয়। শুনানি ও যাচাইয়ের পর বহু নাম ফের যুক্ত হতে পারে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান যে দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এক বড় বিতর্কের ইন্ধন দিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।