কষামাংসের তিন অধ্যায়!
কলকাতার খাদ্যমানচিত্রে এমন কিছু পদ আছে, যাদের নিয়ে বিতর্ক কখনও শেষ হয় না। কষা মাংস সেই তালিকার একেবারে উপরে। কারও মতে শ্যামবাজারের গোলবাড়ি এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ আবার রূপার নরম মাংসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আর একদল খাদ্যরসিকের কাছে শোভাবাজারের মিত্র ক্যাফের কষাই শেষ কথা।
কিন্তু সত্যিই কি গোলবাড়ির জৌলুস ফিকে হয়েছে? নাকি শতবর্ষের ঐতিহ্য এখনও অটুট? সেই উত্তর খুঁজতেই শহরের তিন ঐতিহাসিক ঠিকানায় এক স্বাদযাত্রা।
গোলবাড়ি: যে স্বাদ বাঙালিকে কষা মাংস চিনিয়েছিল
গোলবাড়ি-এর দরজা পেরোলেই যেন সময় কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। ছোট টেবিল, কাঠের টুল, দেওয়ালে চক দিয়ে লেখা মেনু— সব কিছুতেই পুরনো কলকাতার গন্ধ।
১৯২০ সালে পঞ্জাবি ব্যবসায়ী শম্ভু সিংহের হাত ধরে শুরু হয়েছিল এই রেস্তরাঁর পথচলা। তখন নাম ছিল ‘নিউ পঞ্জাবি হোটেল’। পঞ্জাবের ‘কড়াই গোস্ত’-এর রান্নার কৌশলের সঙ্গে বাঙালি মশলা ও সর্ষের তেলের মেলবন্ধনেই জন্ম নেয় আজকের কিংবদন্তি কষা মাংস।
গোলবাড়ির কষার সবচেয়ে বড় পরিচয় তার রং। প্রায় কালো, ঘন, তেলমাখা ঝোল। সর্ষের তেল, ভাজা পেঁয়াজ আর দীর্ঘ সময় ধরে কষানোর ফলে তৈরি হয় সেই স্বতন্ত্র স্বাদ। নরম পরোটা ছিঁড়ে মাংসের ঝোলে ডুবিয়ে মুখে তুললেই বোঝা যায়, কেন এত বছর পরেও এই পদ নিয়ে এত আলোচনা।
সমালোচকেরা বলেন, আগের মতো স্বাদ নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়— যদি এটিই খারাপ হয়, তবে ভালোটা কতটা অসাধারণ ছিল?
রূপা: পরিবারের ভাঙন থেকে জন্ম নেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী
গোলবাড়ির ঠিক উল্টোদিকেই রয়েছে রূপা।
দুই প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে এক পরিবারের সঙ্গে। পারিবারিক মতভেদের জেরে আলাদা পথচলা শুরু করে রূপা। সেই থেকেই কষা মাংসের দুনিয়ায় গোলবাড়ির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
রূপার কষা মাংসেও রয়েছে সেই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশন— সাদা প্লেট, তেঁতুলের চাটনি, স্যালাড এবং পরোটা বা রুটি।
তবে স্বাদে রয়েছে সূক্ষ্ম পার্থক্য। গোলবাড়ির তুলনায় ঝাঁজ কিছুটা কম, মিষ্টি ভাবও প্রায় নেই। মাংস তুলনায় নরম এবং মসৃণ। অনেকের মতে, এটাই রূপার সবচেয়ে বড় শক্তি।
যাঁরা কষা মাংসে ঝাল ও আগ্রাসী স্বাদ খোঁজেন, তাঁরা হয়তো গোলবাড়ির দিকে ঝুঁকবেন। কিন্তু মাংসের কোমলতা যদি অগ্রাধিকার হয়, তা হলে রূপা সহজেই মন জিততে পারে।
মিত্র ক্যাফে: কষার মধ্যে উত্তর কলকাতার অভিজাত ছোঁয়া
কষা মাংসের আলোচনা হবে, আর মিত্র ক্যাফে-র নাম আসবে না— তা হয় না।
এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো এই প্রতিষ্ঠান কষা মাংসকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এখানে মাংসের রং কালচে হলেও গোলবাড়ির মতো মিশকালো নয়। বরং লালচে আভা রয়েছে।
স্বাদে ঝাল ও মিষ্টির ভারসাম্য নজর কাড়ে। সঙ্গে কাঁচালঙ্কার ব্যবহার পদটিকে আলাদা সতেজতা দেয়। ফলে প্রতিটি লোকমায় পাওয়া যায় স্তরবিন্যাস করা স্বাদ।
মিত্র ক্যাফের কষা মাংস কোনও নির্দিষ্ট অনুষঙ্গ নিয়ে আসে না। রুটি, পরোটা বা পাউরুটি— পছন্দমতো বেছে নিতে হয় আলাদা করে। দাম তুলনায় বেশি হলেও স্বাদের সূক্ষ্মতা অনেক খাদ্যরসিকের কাছে তা সার্থক করে তোলে।
শেষ কথা: কেন এখনও গোলবাড়িই মানদণ্ড?
রূপা হয়তো বেশি নরম। মিত্র ক্যাফে হয়তো বেশি পরিশীলিত। তবু কষা মাংসের আলোচনা শুরু হয় এখনও গোলবাড়িকে কেন্দ্র করেই।
কারণ, গোলবাড়ি শুধু একটি রেস্তরাঁ নয়; এটি একটি খাদ্যঐতিহ্য। কলকাতার কষা মাংসের যে পরিচয় আজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছিল এখানেই।
তাই সেরা কোনটি— তার উত্তর ব্যক্তিভেদে বদলাতে পারে। কিন্তু ইতিহাস, প্রভাব এবং স্বাদের স্বকীয়তার বিচারে কষা মাংসের সিংহাসনে গোলবাড়ির দাবিকে এখনও সহজে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। 🍖
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?