সঙ্গীত জগতের বদল নিয়ে আক্ষেপ অন্তরা চৌধুরীর
মাত্র সাত বছর বয়সে প্রথম পুজোর গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন অন্তরা চৌধুরী। সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে তাঁর গাওয়া ‘বুলবুল পাখি ময়না, টিয়ে’ আজও সোনালি যুগের স্মৃতি মনে করায়। সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ অভিজ্ঞ শিল্পী। সময় বদলেছে, বদলেছে সংগীত জগতও। আর সেই বদল নিয়েই মিশ্র অনুভূতি প্রকাশ করলেন অন্তরা।
সম্প্রতি সুদীপ্ত চন্দের কথা ও সুরে গেয়েছেন নতুন পুজোর গান ‘দূর অজানায়’, যা তৈরি হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক ভ্রমণ দিবস’-কে ঘিরে। করোনাকালে গৃহবন্দি মানুষের মনে বেড়ানোর ইচ্ছে জাগানোর উদ্দেশ্যেই এই প্রয়াস। গানটির সঙ্গীতায়োজন করেছেন প্রয়াত সুধীন দাশগুপ্তের পুত্র সৌম্য দাশগুপ্ত — যিনি ভিন্ন পেশা ছেড়ে এই গানের মাধ্যমেই সঙ্গীত জগতে পা রাখলেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ফের পুজোর গান গাওয়া অন্তরার কাছে যেন দুই প্রজন্মকে একসাথে নিয়ে আসার সুযোগ। আনন্দবাজার অনলাইনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “বড় হওয়ার পর বাবা আমার গলায় গাইয়েছিলেন ‘এমন সঘন গহন বর্ষায় তুমি’, ‘ও ভোলা মন’। তখন বয়স কুড়ি। ১৯৯৫-এ বাবার মৃত্যুর পর পুজোর গান তেমন গাওয়া হয়নি। মাঝে রিমেক করেছি, মা সবিতা চৌধুরী বা লতা মঙ্গেশকরের গান গেয়েছি। কিন্তু এখন আর পুজোর গান ঠিক সেইভাবে তৈরি হয় না।”
অন্তরার আক্ষেপ, আগে মানুষ গান “শুনতেন”, এখন তাঁরা গান “দেখেন”। আগে রেকর্ড বেরোনো ছিল এক উৎসব, এখন তার জায়গা নিয়েছে মিউজিক ভিডিও। তিনি বলেন, “আগে শ্রোতারা চোখ বন্ধ করে শুধু গান শুনতেন, তার সুর আর কথার মধ্যে ডুবে যেতেন। এখন সবাই চিত্রনাট্য, সেট, ভিডিও দেখতেই বেশি আগ্রহী।”
তিনি শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাঁর মতে, সংগীত জগতে আজ ভয়াবহ প্রতিযোগিতা চলছে। “আগে রেকর্ড সংস্থাগুলি গানের দায়িত্ব নিত। এখন শিল্পীরাই নিজেরা গান রেকর্ড করে ইউটিউবে ছেড়ে দেন। প্রায় সবাই গাইছেন, ফলে গানের ভিড়ে অনেক ভালো কাজ হারিয়ে যাচ্ছে,” বলেন অন্তরা।
এই বদল শিল্পীদের ক্যারিয়ারকেও কঠিন করে তুলেছে। “একটা গান গেয়েই হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা মান্না দে জনপ্রিয় হয়ে যেতেন। এখন সেই সুযোগ নেই। শিল্পীদের অনেক লড়াই করতে হচ্ছে,” জানান তিনি।
অন্তরা মনে করেন, অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে। “আগে রেকর্ড বা ক্যাসেট বিক্রির হিসাবেই শিল্পীর জনপ্রিয়তা নির্ধারিত হতো। সেই বিক্রি থেকেই শিল্পীর আয়ও হতো। এখন সবটাই বিনামূল্যে। ইউটিউবে গান শুনে কেউ টাকা দেয় না। শিল্পীদের টিকে থাকতে এখন মঞ্চানুষ্ঠানের উপর নির্ভর করতে হয়,” বলেন তিনি।
শুধু অর্থনীতি নয়, বদল এসেছে গানের ধরণ এবং উচ্চারণেও। “এই প্রজন্ম পশ্চিমকে অনুসরণ করতেই ব্যস্ত। সারা ক্ষণ রক আর পাশ্চাত্য সুরে ডুবে থাকে। বাংলা গানেও সেই ছায়া খোঁজে। এমনকি উচ্চারণেও পাশ্চাত্যের প্রভাব পড়েছে। অনেকেই বাংলা শব্দ সঠিকভাবে উচ্চারণও করতে পারেন না,” আফসোস করেন অন্তরা।
বাংলা গানের জগতে নিজের অবদান রেখে যাওয়া এই শিল্পীর কথা আজ অনেকেই অনুভব করেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও সময় বদলেছে ঠিকই, কিন্তু গান মানে শুধু চিত্রনাট্য বা ভিজুয়াল নয় — সেটা হৃদয়ের বিষয়। গানের আসল শক্তি তার সুর, কথা এবং আবেগে। সেটাই যদি হারিয়ে যায়, তবে বাংলা গানের জগৎ তার আত্মা হারাবে।
অন্তরার আশা, নতুন প্রজন্ম সেই কথাই মনে রাখবে। শুধু ভিডিও নয়, গানটিকেও শুনবে, অনুভব করবে — তবেই আবার ফিরবে বাংলা সংগীতের সোনালি দিন।
ব্যালকনির উপর উড়ালপুল! নাগপুরের সেতু স্মরণ করাচ্ছে ভোপালের ৯০ ডিগ্রি রেলসেতুর ঘটনার কথা