এক বছরেই পরমাণু শক্তিধর জাপান?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দেশ পরমাণু অস্ত্রের ভয়াবহতা সবচেয়ে গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিল, সেই জাপানকেই ঘিরে এ বার তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা। রাশিয়ার এক শীর্ষ কর্তার দাবি, চাইলে মাত্র এক বছরের মধ্যেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে টোকিয়ো। আর জাপানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চিনও।
সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহযোগী এবং ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামের আয়োজক কমিটির এগ্জ়িকিউটিভ সেক্রেটারি আন্তন কোবিয়াকভ রুশ সংবাদমাধ্যম তাস-কে বলেন, জাপানের কাছে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও শিল্প সক্ষমতা রয়েছে। তাঁর দাবি, টোকিয়ো চাইলে এক বছরের মধ্যেই পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হতে পারে। একই সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সামরিক নীতিরও সমালোচনা করেছেন তিনি।
জাপানের এই সম্ভাব্য সামরিক উত্থান নিয়ে চিনের উদ্বেগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতেই চিনা কয়েকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, টোকিয়ো গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও জাপান এমন অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
কেন হঠাৎ জাপানের সামরিক শক্তি নিয়ে এত আলোচনা?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার তলায় ছিল জাপান। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে এখনও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি টোকিয়োর নিরাপত্তা ভাবনায় পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের সময় মার্কিন মিত্র দেশগুলিও যে হামলার ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, সেই বিষয়টি জাপানের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পাশাপাশি চিনের সামরিক উত্থান, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিরোধ— সব মিলিয়ে টোকিয়োর নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
এর মধ্যেই প্রতিরক্ষা খাতে জাপানের ব্যয় বৃদ্ধি এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে।
হাতে রয়েছে বিপুল প্লুটোনিয়াম?
জাপানের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ দেশটির বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি। দীর্ঘদিন ধরে পরমাণু শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করে আসছে জাপান। ফলে তাদের কাছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পারমাণবিক উপাদান রয়েছে।
চিনের দাবি, জাপানের হাতে বিপুল পরিমাণ প্লুটোনিয়াম মজুত রয়েছে। চিনা কূটনীতিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এর একটি অংশ অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে কোনও দেশের কাছে বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির জন্য থাকা প্লুটোনিয়ামকে সরাসরি পরমাণু অস্ত্রের সমতুল্য বলে ধরা যায় না। অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, নকশা, অস্ত্রায়ন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
পরমাণু অস্ত্র নিয়ে জাপানের নীতি কী?
১৯৪৫ সালে হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর জাপান দীর্ঘ দিন ধরেই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশটি নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন ট্রিটি বা এনপিটি-তে যোগ দেয়।
এর পাশাপাশি জাপানের রয়েছে বহুল আলোচিত ‘তিন পরমাণু নীতি’। সেগুলি হল— পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করা, পরমাণু অস্ত্র মজুত না রাখা এবং দেশের ভূখণ্ডে পরমাণু অস্ত্র প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া।
যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাপানের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৪ সালে সংবিধানের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকার ব্যবহারের পথ খুলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের অধীনে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেয় টোকিয়ো।
চিন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
চিনের সঙ্গে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে জাপানের। অন্য দিকে, রাশিয়ার সঙ্গে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে টানাপড়েন এখনও অব্যাহত। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি এবং নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাও জাপানের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি কুরিল দ্বীপপুঞ্জের বিতর্কিত এলাকায় পুতিনের সফর নিয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল টোকিয়ো। জাপানের দাবি, ওই দ্বীপগুলি তাদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ফলে একদিকে পুরনো শান্তিবাদী নীতি, অন্য দিকে দ্রুত বদলে যাওয়া আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন জাপানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে জাপান এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে পরমাণু অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়নি। চলতি বছরের হিরোসিমা দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জানিয়েছেন, তাঁর দেশ এখনও তিন পরমাণু নীতির প্রতি দায়বদ্ধ। ভবিষ্যতে সেই অবস্থান কতটা অটুট থাকবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম কৌতূহলের বিষয়।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?।