সংগঠন পুনর্গঠনের ডাক অভিষেকের
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ঘাঁটি আরও মজবুত করতে নেমেছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন সপ্তাহ ধরে সাতটি সাংগঠনিক জেলার নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক বৈঠক সেরে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন— বুথভিত্তিক সংগঠনকে শক্তিশালী না করলে লক্ষ্যপূরণ সম্ভব নয়। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের ৪৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে রয়েছে ২০টি। অভিষেকের লক্ষ্য, আগামী বিধানসভায় এই সংখ্যা আরও বাড়ানো।
বৈঠকগুলিতে প্রতিটি জেলার ভোটের ফলাফল, বুথভিত্তিক পরিসংখ্যান, এবং সংগঠনের শক্তি-দুর্বলতার হিসাব তুলে ধরে নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক। বিশেষত যেসব জেলায় লোকসভা ভোটে তৃণমূলের ফল আশানুরূপ হয়নি, সেখানকার নেতাদের একহাত নিয়েছেন তিনি। দলের অভ্যন্তরে সমন্বয়হীনতা দূর করা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটানো এবং সরকারি প্রকল্পের প্রচারে জোর দেওয়ার নির্দেশও এসেছে তাঁর কাছ থেকে।
২০১৯ সালের লোকসভায় উত্তরবঙ্গে বিজেপির আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা এবং সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে তৃণমূল কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ধূপগুড়ি ও মাদারিহাটের মতো আসন বিজেপির হাত থেকে কেড়ে নেওয়া তার প্রমাণ। অভিষেকের মতে, এই সাফল্যকে বিস্তৃত করতে হলে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি বুথে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করতে হবে।
জেলাভিত্তিক বৈঠকে উঠে এসেছে নানা চিত্র। কোচবিহারে বিজেপি প্রভাবিত এলাকা হলেও এবার তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে পাঁচটি আসনে। অভিষেক জেলার নেতৃত্বকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। জলপাইগুড়িতে বিজেপির জয়ের ব্যবধান কমেছে প্রায় অর্ধেক, যা তৃণমূলের কাছে আশাব্যঞ্জক। সেখানে রাজবংশী ও জনজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যে সরকারি প্রকল্পের প্রচারে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
আলিপুরদুয়ারে মাদারিহাটে উপনির্বাচনে জয় এবং বিজেপি নেতা জন বার্লার তৃণমূলে যোগদানে দল কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে। তবে দার্জিলিং সমতলে ধারাবাহিক ব্যর্থতায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিষেক। শিলিগুড়ি সহ জেলার তিনটি আসনেই এখনও ঘাসফুল ফুটতে পারেনি, তাই পুরনো কর্মীদের পুনরায় সংগঠনের কাজে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
উত্তর দিনাজপুরে রায়গঞ্জের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দলের নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে। চোপড়া, ইটাহারের মতো এলাকায় সংগঠনের সাফল্যের প্রশংসা করলেও অনর্থক মন্তব্য ও বিবাদ এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অভিষেক। দক্ষিণ দিনাজপুরে বালুরঘাট আসনে অল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, “আরও সিরিয়াস হলে এই আসন জেতা যেত।”
মালদহে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে খারাপ ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে দলকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ২০২১ সালে এখানে ভালো ফল করলেও ২০২৪-এর লোকসভায় সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে উত্তরবঙ্গ সফর করেছেন অন্তত ১৫ বার, যা সংগঠনে প্রাণসঞ্চার করেছে। তবে অভিষেকের বৈঠকে স্পষ্ট হয়েছে যে শুধু রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নয়, সংগঠনকে আরও দৃঢ় করতে হবে পরিকল্পিতভাবে।
সব মিলিয়ে, তৃণমূলের লক্ষ্য স্পষ্ট— উত্তরবঙ্গে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি ভেঙে ২০২৬ সালের বিধানসভায় আরও বেশি আসন নিশ্চিত করা। আর তার জন্য এখন থেকেই শুরু হয়েছে বুথভিত্তিক সাংগঠনিক যুদ্ধের প্রস্তুতি।