আমেরিকার দ্বিচারিতা!
ভারতকে ‘একগুঁয়ে’ আখ্যা দিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো। তিনি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গণতন্ত্রের মূল্যবোধের পরিপন্থী। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মন্তব্য আমেরিকার দীর্ঘদিনের দ্বিচারিতারই প্রমাণ।
২৭ অগস্ট থেকে ভারতীয় পণ্যে ৫০% শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর পরেই নাভারো ‘ব্লুমবার্গ’ চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নয়াদিল্লিকে একহাত নেন এবং রাশিয়া থেকে তেল আমদানি নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হয়েও একদলীয় শাসনব্যবস্থার দেশগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, যা দুঃখজনক।’’
তবে এই সমালোচনা শুনে প্রশ্ন তুলেছেন বহু বিশ্লেষক। পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের ইতিহাসই তাদের মতে দ্বিচারিতার উদাহরণ। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ইসলামাবাদের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বারবার সেনা অভ্যুত্থানে পাকিস্তানে গণতন্ত্র বিপর্যস্ত হলেও ওয়াশিংটনের সমর্থন কখনও কমেনি। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় পরোক্ষভাবে এই দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করেছেন।
একই চিত্র পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতেও। সৌদি আরব বা কাতারের মতো রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দেশগুলির সঙ্গে আমেরিকার গভীর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুললে ওয়াশিংটন তা এড়িয়ে যায়। অথচ ভারতের রাশিয়া-সম্পর্ক নিয়েই বারবার আঙুল তোলা হয়।
ভারতীয় নাগরিকদের এইচ-১বি ভিসা নিয়েও মার্কিন রাজনীতিতে হাহাকার চলছে। রিপাবলিকান নেতা রন ডিস্যান্টিসের দাবি, ভারতীয় কর্মীদের জন্য মার্কিন তরুণদের চাকরি সংকট তৈরি হচ্ছে। অথচ বাস্তবে সাম্প্রতিক মার্কিন বন্দুকবাজ হামলাগুলির সঙ্গে এই ভিসাধারীদের কোনও যোগ পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে মিনিয়াপলিসে ঘটে গেছে ভয়াবহ স্কুল হামলা। ২৩ বছরের রবিন ওয়েস্টম্যান নামে এক বন্দুকবাজ স্কুলে ঢুকে গুলি চালিয়ে দুই শিশুকে হত্যা করে এবং ১৭ জনকে আহত করে। তাঁর অস্ত্রের গায়ে লেখা ছিল ভারত ও ইজরায়েলবিরোধী স্লোগান। হামলার দায়ে আত্মহত্যা করেন ওয়েস্টম্যান। এই ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হয়েছে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বড় হুমকি দেশীয় নাগরিকদের থেকেই আসছে। তবুও অভিবাসী ও ভিসাধারীদের দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে নিয়মিত।
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলা নতুন নয়। গত সাত মাসে অন্তত ২৮৬টি বড় হামলায় শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। আমেরিকার ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট লিঙ্কন থেকে শুরু করে কেনেডি পর্যন্ত বহু নেতার হত্যাকাণ্ডের পেছনেও স্থানীয় নাগরিকদের হাতই ধরা পড়েছে। এমনকি গত বছর ট্রাম্পের উপর হত্যাচেষ্টাকারী টমাস ম্যাথু ক্রুকসও ছিলেন মার্কিন নাগরিক।
এদিকে, একই সময়ে আমেরিকা ছয় লক্ষ চীনা শিক্ষার্থীকে ভিসা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। পরে নিরাপত্তা-ঝুঁকির আশঙ্কায় সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। চীনা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি চুরির অভিযোগ উঠলেও ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে তেমন কিছু প্রমাণ মেলেনি। তবুও সমালোচনার নিশানায় রয়েছে ভারত।
সবশেষে, নাভারোর ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘মোদীর যুদ্ধ’ আখ্যা দেওয়ার মন্তব্য আরও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের শুরু থেকেই কিয়েভকে বিশাল অস্ত্র সহায়তা দিয়ে এসেছে ওয়াশিংটন। অথচ দোষ চাপানো হচ্ছে ভারতের উপর, যা আমেরিকার কূটনৈতিক দ্বিমুখী চরিত্রকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
চলমান পরিস্থিতি শুধু আমেরিকার ভণ্ডামিকেই সামনে এনেছে না, বরং বিশ্ব মঞ্চে ভারতের অবস্থান নিয়েও নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।