অটোমান সাম্রাজ্যের স্বপ্নে বিভোর!
একসময় ইউরোপ থেকে এশিয়া মাইনর হয়ে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল অটোমান সাম্রাজ্য। আজ, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সেই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষা তুরস্ককে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তুরস্ক, যা একসময় ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’ নামে পরিচিত ছিল, আজ নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বে দেশটি ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত নিজেদের সীমান্ত সম্প্রসারণ এবং পুরনো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছে। এর জন্য তিনি ইসলামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন ‘ধর্মযুদ্ধের’ আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণে এশিয়া মাইনর এবং পূর্বে ইউরোপের বলকান এলাকা—এই দুইয়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই মুসলিম প্রধান দেশটি। একসময় এখান থেকেই সুবিশাল অটোমান সাম্রাজ্য পরিচালিত হতো, যা ইউরোপ, আরব দুনিয়া এবং আফ্রিকার একটি বড় অংশকে শাসন করত। ইতিহাসের সেই গৌরব ফিরিয়ে আনতে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আজ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো অটোমান সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এরদোয়ান একটি আগ্রাসী নীতি অনুসরণ করছেন। সিরিয়া ও লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা, আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মধ্যে সংঘর্ষে তাঁর সংশ্লিষ্টতা, এমনকি মিশরসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি—সবই এই নীতির অংশ। অনেকে মনে করেন, মুসলিম বিশ্বের ‘খলিফা’র আসনপ্রাপ্তিই এরদোয়ানের মূল লক্ষ্য। এ কারণে তিনি সৌদি আরবকে পিছনে ফেলে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থায় (ওআইসি) নিজের অবস্থান মজবুত করতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছেন।
১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ওআইসিতে ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র রয়েছে। এতদিন এই সংস্থার নেতৃত্বে ছিল সৌদি আরব। কিন্তু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ইসলামের প্রচার, ধর্মীয় শিক্ষা এবং মসজিদ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ওআইসি-ভুক্ত রাষ্ট্রগুলিতে নিজের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এরদোয়ানের পরিকল্পনার প্রথম ধাপ সিরিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন দিয়ে তিনি সেখানে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এছাড়া, উত্তর সিরিয়ার কিছু এলাকা তুর্কি সেনা দখল করেছে, যেখানে ‘সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ নামে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়েছে। কুর্দ জনজাতির নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলিও এরদোয়ানের লক্ষ্যবস্তু, যেখানে তিনি কুর্দদের বিতাড়িত করে ওই অঞ্চলগুলি তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত করতে চান।
লিবিয়ার ক্ষেত্রেও তুরস্কের প্রেসিডেন্টের নজর অর্থনৈতিক স্বার্থে। লিবিয়ার মাটির নিচে বিপুল খনিজ তেলের ভান্ডার রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলার। এই ‘তরল সোনা’ আঙ্কারায় আনতে এরদোয়ান লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে সরাসরি ফৌজ পাঠিয়েছেন এবং ত্রিপোলির সরকারের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি করেছেন।
ভূমধ্যসাগরে ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জ়োন’ প্রতিষ্ঠা করে তুরস্ক সেখানে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করেছে। এটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে গ্যাসের পাইপলাইন প্রকল্পগুলিতে তুরস্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে বড় মুনাফা আনতে পারে।
এছাড়া, সাইপ্রাস দ্বীপের ৩৭ শতাংশের বেশি এলাকা তুরস্ক দখল করেছে। সেখানে তুর্কিদের পুনর্বাসন দিয়ে জনবিন্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এই পদক্ষেপগুলি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান অটোমান সাম্রাজ্যের পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর।
তবে, এই লক্ষ্য পূরণে এরদোয়ানের সামনে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। প্রথমত, তুরস্কের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ নাজুক। দ্বিতীয়ত, অটোমান সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া অনেক দেশ এখন শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তাদের সবাইকে হারিয়ে পুরনো গৌরব ফিরে পাওয়া শুধু কঠিন নয়, অনেকের মতে অসম্ভব।
তুরস্কের জনগণও এরদোয়ানের এই নীতিতে বিভক্ত। ২০২৩ সালের নির্বাচনে এরদোয়ান পুনর্নির্বাচিত হলেও, বিরোধী প্রার্থী কামাল কিলিচদারোগ্লু প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এটি স্পষ্ট করে যে, দেশের একটি বড় অংশ এরদোয়ানের নীতির বিরুদ্ধে। তবে, এরদোয়ানের সমর্থকরা তাঁর নেতৃত্বে তুরস্কের পুরনো গৌর
বিচ্ছেদের পর বিশাল অঙ্কের খোরপোশ দিতে হবে যুজবেন্দ্র চহল! আদালতের রায়ে আলোড়ন