সিন্ধু লিপির জট কি এআই খুলতে পারবে?
প্রায় চার হাজার বছর আগে সিন্ধু নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন অধ্যায়—সিন্ধু সভ্যতা। আজকের পাকিস্তান, পশ্চিম ভারত এবং আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এই সভ্যতা আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এত বছর পরেও এর সবচেয়ে বড় রহস্য রয়ে গেছে অমীমাংসিত—সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া পাথর ও পোড়া মাটির ফলকে খোদাই করা রয়েছে অদ্ভুত সব চিহ্ন। কোথাও ইংরেজি ‘U’-এর মতো আকৃতি, যার দুই পাশে তিনটি করে আঙুলের মতো রেখা; কোথাও হিরের মতো চৌকো চিহ্ন, আবার কোথাও চাকার মতো নকশা। এগুলো কি কোনও ভাষার অক্ষর, না কি নিছক প্রতীক—তা নিয়ে আজও ধোঁয়াশা কাটেনি।
গবেষকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে এই সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল। এখন পর্যন্ত হাজারেরও বেশি লিপিযুক্ত নিদর্শন পাওয়া গেলেও সেগুলির বেশিরভাগই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত—একটি লিপিতে গড়ে পাঁচটির বেশি চিহ্ন নেই। ফলে কোনও ধারাবাহিক ভাষা বা বাক্য গঠন বোঝা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই রহস্য ঘিরে নানা মত রয়েছে। একদল গবেষক মনে করেন, এটি কোনও পূর্ণাঙ্গ ভাষা নয়, বরং প্রতীক-ভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা—যা দিয়ে ব্যক্তি, বস্তু বা ধারণা বোঝানো হত। আবার অন্যদের মতে, এটি একটি হারিয়ে যাওয়া ভাষা, যার ব্যাকরণ ও অর্থ এখনও আমাদের অজানা। প্রায় ১০০-র মতো ভিন্ন প্রতীক পাওয়া গেছে, কিন্তু তাদের অর্থ নিয়ে ঐকমত্য নেই বলেই পাঠোদ্ধার এতদিনে সম্ভব হয়নি।
গবেষক স্টিভ বন্টা দাবি করেন, নব্বইয়ের দশকেই এই লিপির অনেকটাই পাঠোদ্ধার হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হওয়ায় তা স্বীকৃতি পায়নি। এছাড়া, লিপিতে প্রতীকের পুনরাবৃত্তিও বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে—একই চিহ্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে কী বোঝায়, তা নির্ধারণ করা কঠিন।
এই জটিল পরিস্থিতিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকেরা এখন ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রতীকগুলির মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। নেব্রাস্কা-লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার রেভেস মনে করেন, এআই এই গবেষণায় বড় ভূমিকা নিতে পারে। ইতিমধ্যেই ডেটা মাইনিং ও সংখ্যাতত্ত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা চলছে কোন প্রতীকগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
তবে সকলেই সমান আশাবাদী নন। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাজেশ রাওয়ের মতে, সিন্ধু লিপির একটি নির্দিষ্ট গঠন বা প্যাটার্ন বিজ্ঞানীরা ধরতে পারলেও সম্পূর্ণ অর্থ উদ্ধার করা এখনও কঠিন। কারণ, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং দীর্ঘ বাক্যের অনুপস্থিতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে কিছু অগ্রগতি হয়েছে বলেই দাবি গবেষকদের। লিপিতে থাকা উল্লম্ব রেখাগুলিকে সংখ্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে যদি আরও নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়, তাহলে এই সংখ্যাতত্ত্ব আরও পরিষ্কার হতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখনও রয়ে গেছে—সিন্ধু সভ্যতার মানুষরা ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন? এআই হয়তো সেই রহস্যের দরজা খানিকটা খুলতে সাহায্য করবে, কিন্তু শেষ কথা বলবেন মানুষই। ইতিহাসের এই প্রাচীন ধাঁধা হয়তো একদিন সমাধান হবে—তবে তার জন্য এখনও অপেক্ষা করতে হবে।
ধীরে ধীরে কমান চিনির অভ্যাস: স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কার্যকর কয়েকটি সহজ উপায়