বদলে যাচ্ছে সমুদ্রের স্বাদ!
সমুদ্রের জলের নোনাভাবও যে সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, সাম্প্রতিক এক গবেষণা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, Indian Ocean-এর দক্ষিণ অংশে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে নুনের পরিমাণ। এই পরিবর্তনের পেছনে দায়ী বায়ুমণ্ডলের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন। আর তার প্রভাব ভবিষ্যতে পরিবেশ ও আবহাওয়ার উপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।
দীর্ঘদিন ধরেই জানা ছিল, দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের জল তুলনামূলকভাবে বেশি নোনতা। প্রখর সূর্যতাপে এখানকার জল দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। ফলে জলে থাকা লবণ থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে তার ঘনত্ব বাড়ে। সেই কারণেই দক্ষিণ গোলার্ধে সবচেয়ে নোনতা জল পাওয়া যেত এই অংশে।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সাগর ও মহাসাগরের জলের নমুনা পরীক্ষা করে আসছেন। কোথায় কতটা নুন রয়েছে, সেই তথ্য ব্যবহার করেই তাঁরা সমুদ্রস্রোতের গতি ও দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পেয়েছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের জল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হয়েছে।
পুরনো সেই পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাম্প্রতিক তথ্য মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলের জলে নুনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গত প্রায় ৬০ বছরে সেখানে নোনাভাব কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।
এই গবেষণা চালিয়েছেন University of Colorado Boulder-এর একদল বিজ্ঞানী। প্রথমে তাঁদের ধারণা ছিল, হয়তো ওই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রের জলে নুনের মাত্রা কমছে। কিন্তু পরে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রক্রিয়া।
গবেষণায় উঠে এসেছে একটি বিশাল মিষ্টি জলের অঞ্চল, যাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক ফ্রেশওয়াটার পুল’। এই জলাধারটি নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পূর্ব ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই এলাকায় প্রায় সারা বছরই প্রবল বৃষ্টিপাত হয়, ফলে সমুদ্রের উপরিভাগের জল তুলনামূলকভাবে কম নোনতা থাকে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালনের ধরন বা অ্যাটমোস্ফিয়ারিক সার্কুলেশন প্যাটার্ন বদলে যাওয়ায় সমুদ্রস্রোতের দিকেও পরিবর্তন এসেছে। তার ফলেই এই কম নোনতা জল দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে পৌঁছে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলার ফলেই ওই অঞ্চলের জলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে নুনের মাত্রা।
তবে বিষয়টি শুধু সমুদ্রের স্বাদের পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় প্রভাব পড়তে পারে পরিবেশ ও আবহাওয়ার উপরও। সমুদ্রের জলে কতটা লবণ রয়েছে, তার উপর নির্ভর করে জলের ঘনত্ব। আর সেই ঘনত্বই সমুদ্রস্রোতের গতি ও দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
যদি জলের ঘনত্ব বদলে যায়, তবে স্রোতের প্রবাহেও পরিবর্তন ঘটতে পারে। আর সমুদ্রস্রোতই অনেকাংশে নির্ধারণ করে পৃথিবীর আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের ধরণ।
বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করেছেন, বায়ুমণ্ডলের সঞ্চালনে পরিবর্তনের কারণে Amazon rainforest-এর কিছু অঞ্চলে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত কমে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই গবেষকদের আশঙ্কা—দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের নোনাভাব কমে যাওয়ার প্রভাবও ভবিষ্যতে জলবায়ু ও পরিবেশে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, সমুদ্রের এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থায় বড় ধরনের রদবদল যে নীরবে ঘটছে, তার আরেকটি ইঙ্গিত হয়তো লুকিয়ে রয়েছে এই নোনাভাবের পরিবর্তনের মধ্যেই।
রাহার জন্মের পর দ্রুত ওজন কমিয়ে কটাক্ষের শিকার আলিয়া, কী ছিল তাঁর রহস্য?