সমুদ্রের নীচে লুকোনো রহস্য
বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল—নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উধাও হয়ে যাওয়া জাহাজ, নিখোঁজ বিমান আর অজানা আতঙ্কের গল্প। অতলান্তিক মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে পুয়ের্তো রিকো, মিয়ামি ও বারমুডাকে যুক্ত করে যে কল্পিত ত্রিভুজ আঁকা হয়, তাকেই ঘিরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে উঠেছে রহস্য আর কল্পকাহিনি। এত দিন প্রশ্ন ছিল—এ সবের পিছনে কি আদৌ কোনও বৈজ্ঞানিক কারণ আছে? এবার হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পথে এক ধাপ এগোলেন গবেষকেরা।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বারমুডা দ্বীপের নীচে সমুদ্রতলের গভীরে একেবারে ব্যতিক্রমী একটি পাথুরে কাঠামোর সন্ধান মিলেছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই স্তর পৃথিবীর অন্য কোনও সমুদ্রাঞ্চলে দেখা যায়নি। গবেষকদের দাবি, এই অস্বাভাবিক ভূগর্ভস্থ গঠনই হয়তো বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলকে বিশ্বের অন্যান্য জায়গা থেকে আলাদা করে তুলেছে।
আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘জিওফিজ়িক্যাল রিসার্চ লেটার্স’ নামের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকায়। গবেষকদলের প্রধান উইলিয়াম ফ্রেজ়ার ব্যাখ্যা করে বলেন, সাধারণত সমুদ্রতলের নীচে সরাসরি পৃথিবীর ম্যান্টেল স্তর শুরু হয়ে যায়। কিন্তু বারমুডার ক্ষেত্রে তা হয়নি। এখানে সমুদ্রত্বকের নীচে ম্যান্টেল শুরু হওয়ার আগেই আরও একটি অজানা স্তর রয়েছে—যেন কেউ ইচ্ছে করেই সেই পাথরের স্তরটি সেখানে ‘ঢুকিয়ে’ দিয়েছে।
এই স্তরের উৎস এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, বারমুডা ঘিরে যে অস্বাভাবিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—তার সঙ্গে এই কাঠামোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, বারমুডার আশপাশে সমুদ্রের জলস্তর তুলনামূলক ভাবে উঁচু এবং সমুদ্রতল খানিকটা ফুলে থাকা অবস্থায় রয়েছে। এত দিন এই উচ্চতার কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অনেকেই আগে মনে করতেন, সমুদ্রের নীচে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বা মিথেন গ্যাসের নির্গমন এই পরিবর্তনের কারণ। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বারমুডার আশপাশে শেষ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়েছিল প্রায় ৩ কোটি ১০ লক্ষ বছর আগে। তার পর থেকে ওই এলাকায় কোনও সক্রিয় আগ্নেয়গিরির চিহ্ন নেই।
তবে বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, সেই প্রাচীন আগ্নেয়গিরির যুগেই রহস্যের সূত্রপাত। ধারাবাহিক অগ্নুৎপাতের সময় ম্যান্টেলের গলিত পাথর সমুদ্রত্বকের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল এবং তার কিছু অংশ আজও সেখানে আটকে রয়েছে। এর ফলেই সমুদ্রতল প্রায় ১৬৪০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়ে আছে। পৃথিবীর অন্য জায়গায় ‘ম্যান্টেল হটস্পট’-এর কারণে এমন ঘটনা ঘটলেও, ভূত্বক সরে গেলে সাধারণত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়। বারমুডার ক্ষেত্রে তা হয়নি—এটাই গবেষকদের কাছে সবচেয়ে বড় ধাঁধা।
ম্যাসাচুসেটসের ভূবিজ্ঞানী সারা মাজ়ার কথায়, “বারমুডার নীচে অতীতের আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার কিছু অবশেষ এখনও রয়ে গিয়েছে। উপর থেকে তা চোখে পড়ে না, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার প্রভাব কাজ করছে।”
এই নতুন আবিষ্কার কি বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলের সব রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান দেবে? হয়তো এখনও নয়। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, কল্পকাহিনির বাইরে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান এবার সত্যিই এই রহস্যের গভীরে পৌঁছনোর পথ দেখাচ্ছে।