শতবর্ষী স্কুলের ঋণ স্বীকার এক প্রাক্তনীর!
নবম আর দশম— মাত্র দু’বছর। কিন্তু জীবনের মানচিত্রে এই দু’বছরের ছাপ আজও গভীর। বাবার বদলির সূত্রে আসানসোল থেকে কলকাতায় এসে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৭৯ সালে। তখন ভাবিনি, এই অল্প সময়ই আমার চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ আর জীবনের দিশা এতটা স্পষ্ট করে দেবে। আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই দু’বছরই আমাকে সত্যিকারের মানুষ করে তুলেছিল।
৩ জানুয়ারি বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শতবর্ষে পা দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে স্মৃতির দরজা খুলে যাচ্ছে বারবার। বিশাল স্কুলভবন, সামনে খোলা মাঠ, বড় জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া আলো, প্রার্থনাকক্ষের উঁচু ছাদ— এই সবই যেন আমাদের শেখার অংশ ছিল। তবে তার থেকেও বড় ছিলেন আমাদের শিক্ষকরা। তাঁদের জ্ঞান, পাণ্ডিত্য আর মানবিকতা আজও মনে গেঁথে আছে।
আমি দীর্ঘদিন কলকাতার বাইরে থেকেছি, তবু স্কুলের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি। প্রিয় শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল, বন্ধুত্বও অটুট থেকেছে। শতবর্ষ উদ্যাপনের শুরুতে উপস্থিত থাকতে না পারার আফসোস আছে, তবে আগামী বছর নিশ্চয়ই এই প্রাঙ্গনে ফিরে আসব— ছাত্র হিসেবে নয়, কৃতজ্ঞ এক প্রাক্তনী হিসেবে।
বালিগঞ্জ সরকারি স্কুল আর কলকাতা যেন একে অপরের পরিপূরক। এই স্কুল কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। খেলাধুলো, নাটক, গান— সব কিছুর জন্য ছিল অকুণ্ঠ উৎসাহ। মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলেছি, মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গেয়েছি, নাটক করেছি। শিক্ষকরা কখনও বলেননি, “এগুলো পড়াশোনার বাইরে।” বরং বুঝিয়েছেন, মানুষ হতে গেলে এগুলোও জরুরি।
আমাদের শিক্ষকদের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। অঙ্কের কাশীনাথ খামরুই বা সুনীলবাবু, ইংরেজির প্রভাতবাবু, বাংলার মনোরঞ্জনবাবু, ইতিহাসের শৈলেশবাবু— প্রত্যেকেই আমাদের ভিত গড়ে দিয়েছেন। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সাহিত্য আর ইতিহাসের প্রতি যে ভালোবাসা আজও বহন করি, তার নেপথ্যে তাঁদেরই অবদান। আজও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থাকি, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা করি— এ সবের বীজ রোপণ হয়েছিল স্কুলেই।
সেই সময়ের সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের মেধা আর মননের কথা বললে গর্ব হয়। তাঁরা অনায়াসে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পারতেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, সেই নিষ্ঠা আর পাণ্ডিত্যের ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে— এটা আমার ব্যক্তিগত আক্ষেপ।
মাধ্যমিকের পরে স্কুল বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সরকারি স্কুলে শিক্ষকের অভাব ছিল বলে ইংরেজি মাধ্যমে গিয়েছিলাম। আজ নির্দ্বিধায় বলি, সেটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, ভাষা বদলালেই শিক্ষা উন্নত হয় না।
আজকাল বাংলা মাধ্যম বনাম ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে অনেক তর্ক হয়। বলা হয়, বাংলা মাধ্যমে পড়লে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিন্তু আমাদের প্রজন্ম তার জীবন্ত প্রমাণ— বাংলা মাধ্যমে পড়ে আমরা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, দেশ-বিদেশে কাজ— সবই করেছি, কোথাও পিছিয়ে পড়িনি। ইংরেজির ব্যাকরণগত ভুল আমরা যেমন করেছি, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ারাও তাই করেছে।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়াই সবচেয়ে শক্ত ভিত তৈরি করে। আজ যখন বাংলা ভাষার চর্চা ক্রমশ কমছে, তখন এই বিশ্বাস আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। যদি আমাকে কৃতী প্রাক্তনী বলা হয়, তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি— বাংলা মাধ্যমে পড়লেই ভাষার প্রতি টান তৈরি হয়, আর সেই টানই মানুষকে ভিতর থেকে সমৃদ্ধ করে। বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় আমাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছে।