বিড়ি নিয়ে বচসায় মুর্শিদাবাদের শ্রমিকের মৃত্যু!
একটা বিড়ি। ছোট্ট এক অনুরোধ থেকেই শুরু হয়েছিল কথা-কাটাকাটি। আর সেই সামান্য ঝামেলাই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল এক পরিযায়ী শ্রমিকের প্রাণ। মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা জুয়েল শেখের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝেই ওড়িশা পুলিশ স্পষ্ট জানাল— এই হত্যার নেপথ্যে ভাষা বা পরিচয়ের কোনও প্রশ্ন নেই। বাংলা বলা বা ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহ নয়, নিছক বিড়ি নিয়ে বচসার জেরেই মারধরে মৃত্যু হয়েছে জুয়েলের।
ওড়িশার সম্বলপুরে নির্মাণকাজে যুক্ত ছিলেন জুয়েল। তাঁর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েক জন শ্রমিকও কাজ করতেন। বুধবার রাতে কাজ সেরে ফেরার পথে সম্বলপুরের শান্তিনগর এলাকায় তাঁদের সঙ্গে ছ’জন স্থানীয় যুবকের মুখোমুখি হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ওই দলের এক জন জুয়েলের কাছ থেকে একটি বিড়ি চান। সেই কথোপকথন থেকেই বচসা শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত হাতাহাতিতে গড়ায়। অভিযোগ, সেই সময় জুয়েলকে লক্ষ্য করে বেধড়ক মারধর করা হয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সম্বলপুরের হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসা চলাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর দ্রুত তদন্তে নেমে পুলিশ ছ’জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে। ওড়িশা পুলিশের নর্দান রেঞ্জের আইজি হিমাংশুকুমার লাল জানিয়েছেন, “এই ঘটনায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে।”
তবে ঘটনার পরেই বিষয়টি রাজনৈতিক রং নেয়। পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তোলে, বাংলা বলার কারণেই জুয়েলকে খুন করা হয়েছে। সমাজমাধ্যমে দলের তরফে বলা হয়, বিজেপির “বাংলাবিরোধী প্রচারের” ফলেই পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এমন হামলা হচ্ছে। তৃণমূলের দাবি, বাঙালি মানেই অনুপ্রবেশকারী— এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর তারই পরিণতিতে দেশের এক নাগরিককে পিটিয়ে হত্যা করা হল।
এই অভিযোগের জবাবে ওড়িশা পুলিশ স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। আইজি হিমাংশু লাল জানিয়েছেন, নিহত ব্যক্তি বাঙালি না বাংলাদেশি— এই প্রশ্নের সঙ্গে হত্যার কোনও যোগ নেই। তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে এটি নিছক ব্যক্তিগত ঝামেলা, যার সূত্রপাত একটি বিড়িকে ঘিরে। ভাষা বা পরিচয়ের কারণে হামলার কোনও প্রমাণ মেলেনি বলেই দাবি পুলিশের।
এই ঘটনায় মুর্শিদাবাদের জুয়েলের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রাজ্য থেকে জনপ্রতিনিধিরা তাঁর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন। কিন্তু শোকের পাশাপাশি প্রশ্নও থেকেই যাচ্ছে— ভিন্রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকেরা কতটা নিরাপদ? ছোট্ট এক তর্ক কী ভাবে মুহূর্তে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, জুয়েলের মৃত্যু সেই কঠিন বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
আইনি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, অভিযুক্তরা গ্রেফতার। তবু এক জন শ্রমিকের জীবন আর ফিরবে না। রাজনীতি আর ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে, এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়— সহিংসতার মূল্য কোনও তর্কেই মেটানো যায় না।