বাম্পার লাভের হাতছানি, কিন্তু বিপদের ছায়া!
কৃত্রিম মেধা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এই দৌড়ে আমেরিকার টেক জায়ান্টদের কড়া চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চিন। নতুন নতুন এআই মডেল, কম খরচে প্রযুক্তি আর দ্রুত বাস্তবায়নের জেরে চীনা সংস্থাগুলির শেয়ার সূচক সাম্প্রতিক কালে নজরকাড়া উত্থান দেখিয়েছে। আর সেই উত্থানের সুযোগ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের একাংশ।
কিন্তু সমস্যা একটাই— ভারত থেকে সরাসরি চীনা শেয়ার বাজারে লগ্নি করা যায় না। সেই বাধা টপকাতেই বেছে নেওয়া হয়েছে ঘুরপথ। দেশের বেশ কিছু মিউচুয়াল ফান্ড ব্রিটেন ও আমেরিকার আর্থিক সংস্থার মাধ্যমে চিনের বাজারে টাকা ঢালছে। এই পদ্ধতির নাম ‘ফান্ড অফ ফান্ডস’ বা এফওএফ। অর্থাৎ, ভারতীয় ফান্ড সরাসরি চীনা শেয়ার না কিনে, বিদেশি কোনও ফান্ডে লগ্নি করছে— যে ফান্ড আবার চিনের স্টকে বিনিয়োগ করে।
এই কৌশলের ফল মিলছেও চোখে পড়ার মতো। সংশ্লিষ্ট ফান্ডগুলির দাবি, এক থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি রিটার্ন এসেছে। স্বাভাবিক ভাবেই এত লাভের খবরে উৎসাহ বাড়ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। বিশেষ করে চীনের এআই-কেন্দ্রিক টেক সংস্থাগুলির পারফরম্যান্স এই ‘ষাঁড়ের দৌড়’-এর মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে ‘ডিপসিক-আর১’-এর নাম। চলতি বছরের শুরুতে এই জেনারেটিভ এআই মডেল বাজারে আসতেই মার্কিন প্রযুক্তি দুনিয়ায় আলোড়ন পড়ে যায়। এমনকি এক দিনে এনভিডিয়ার মতো সংস্থার বাজারমূল্যে বিশাল ধস নামে। যদিও পরে তারা ঘুরে দাঁড়ায়, কিন্তু তত দিনে চিনা প্রযুক্তির ক্ষমতা নিয়ে আলোচনা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এই আবহেই প্রশ্ন উঠছে— ভারত কি তবে ঝুঁকি জেনেও ‘ড্রাগনের গুহা’য় ঢুকছে? আর্থিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, লাভ যতই আকর্ষণীয় হোক, ঝুঁকিও কম নয়। চীনের শেয়ার বাজার অনেকটাই নির্ভরশীল আমেরিকা-চিন রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপর। দু’দেশের মধ্যে শুল্কযুদ্ধ, প্রযুক্তি চুরির অভিযোগ কিংবা নিষেধাজ্ঞা— যে কোনও একটি ঘটনায় বাজারের ছবি রাতারাতি বদলে যেতে পারে।
আরও বড় আশঙ্কা রয়েছে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত। ভবিষ্যতে যদি আমেরিকা কোনও চীনা টেক সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট বিদেশি ফান্ডকে কালো তালিকাভুক্ত করে, তা হলে সেই পথে বিনিয়োগ করা ভারতীয় অর্থ আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তখন লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া চিনের এআই দৌড়ে বিদ্যুৎ খরচ ও পরিকাঠামোর উপর চাপও বাড়ছে। প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে খরচ বেড়েছে বহুগুণ। একই সঙ্গে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতও নিজেদের এআই প্রযুক্তি নিয়ে জোর কদমে এগোচ্ছে। আগামী দিনে এই প্রতিযোগিতায় চীনের বাজারে তৈরি হওয়া ‘এআই বুদবুদ’ ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে ছবি দু’মুখো। এক দিকে দ্রুত লাভের হাতছানি, অন্য দিকে ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন আর নীতিগত অনিশ্চয়তা। তাই বিশ্লেষকদের পরামর্শ— চোখধাঁধানো রিটার্ন দেখে ঝাঁপ দেওয়ার আগে ঝুঁকির দিকটা ভাল করে বুঝে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ড্রাগনের গুহায় ঢোকা যায়, কিন্তু চোখ বেঁধে নয়।