জানালেন কেন নিলেন জীবনের বড় সিদ্ধান্ত
১৯৮৪ সাল। দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীর হত্যার পর রাজনৈতিক আবহে তুমুল আলোড়ন। সেই সময়ই বলিউডের সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন এক অবাক করা সিদ্ধান্ত নেন—কংগ্রেস দলে যোগ দিয়ে সরাসরি লোকসভা নির্বাচনের ময়দানে নামেন তিনি। এলাহাবাদ (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) থেকে প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন। জনপ্রিয়তার জোয়ারে তাঁর জয় তখন রাজনীতির অঙ্গনেও আলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। কেন এমন করলেন বলিউডের শাহেনশাহ?
সম্প্রতি জনপ্রিয় কুইজ শো ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি ১৭’-র মঞ্চে নিজেই জানিয়েছেন সেই কারণ। অমিতাভ খোলাখুলি বলেন, “আমি আসলে আবেগপ্রবণ হয়ে রাজনীতিতে পা রেখেছিলাম। এলাহাবাদ আমার জন্মস্থান। সেখানকার মানুষ আমাকে খুব ভালবাসতেন, সেই ভালোবাসার জোরেই বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছি।”
কিন্তু রাজনৈতিক জীবনের বাস্তবতা খুব তাড়াতাড়িই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, জনপ্রিয়তা আর দায়িত্ব – এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট ফারাক। অমিতাভর কথায়, “কয়েক দিন পরই বুঝতে পারি, রাজনীতি খুব কঠিন কাজ। এখানে প্রতিটি দিক সামলাতে হয়, নানা মানুষের কথা শুনতে হয়, প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এটা কেবল বক্তৃতা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য দায়িত্ব ও জটিলতা।”
এই কঠিন বাস্তবতাই তাঁকে বুঝতে শেখায় ভারতের সাধারণ মানুষের প্রকৃত জীবনযাপন। রাজনীতির অল্প দিনের অভিজ্ঞতা নিয়েও অমিতাভ বলেন, “ওই দু’টো বছর আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ তখন আমি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি, কেমন আশা-ভরসা নিয়ে তাঁরা আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। নির্বাচনে নতুন কেউ লড়তে এলে তাঁরা তাকে যে কত সম্মান দেন, সেটা সত্যিই অবিস্মরণীয়।”
১৯৮৪ সালে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত বলিউডেও ছিল বড় আলোচনার বিষয়। তখন তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে, আর সিনেমার দুনিয়া থেকে সংসদে প্রবেশ তাঁর জয়ের সম্ভাবনাকেও আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফলও মিলেছিল হাতেনাতে—বিরোধী প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে সংসদে পৌঁছে যান অমিতাভ।
কিন্তু সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তাঁর জীবনে নেমে আসে বড় ধাক্কা। ১৯৮৭ সালে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তাঁর নাম জড়িয়ে যায়। যদিও পরে তিনি কোনও মামলায় দোষী প্রমাণিত হননি, কিন্তু জনজীবনের কঠিন বাস্তব এবং বিতর্কের তীব্রতা তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। তখনই তিনি রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
অমিতাভ নিজেই স্বীকার করেন, রাজনীতি তাঁর পক্ষে নয়। সিনেমার জগৎ এবং রাজনীতির মঞ্চ একেবারেই আলাদা, আর জননেতা হওয়া শুধুই জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না, তার জন্য প্রয়োজন অন্য ধরনের দায়বদ্ধতা ও প্রস্তুতি।
আজও অমিতাভ বচ্চনকে ঘিরে রয়েছে কোটি ভক্তের ভালোবাসা। সিনেমার পর্দায় তিনি যেমন অবিস্মরণীয় ছাপ রেখেছেন, তেমনই জীবনের সেই সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক অধ্যায়ও তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। রাজনীতি থেকে দূরে সরে এলেও সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছে।
বিপুল ভোটে জয়ী হয়েও স্বেচ্ছায় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো অমিতাভের সিদ্ধান্ত আজও বিরল। কারণ জনপ্রিয়তার চূড়ায় থেকেও তিনি বুঝেছিলেন – রাজনীতি কেবল জয় বা পদ নয়, এটা মানুষের জীবন ও সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার নাম। আর সেই দায়বদ্ধতার ভার সামলানোর চেয়ে নিজের জায়গায় থেকেই মানুষের ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়াকেই বেছে নিয়েছিলেন বলিউডের এই শাহেনশাহ।
ব্যালকনির উপর উড়ালপুল! নাগপুরের সেতু স্মরণ করাচ্ছে ভোপালের ৯০ ডিগ্রি রেলসেতুর ঘটনার কথা