আজ কেন এ লিগ প্রশ্নের মুখে?
এক সময় ছিল, যখন কলকাতা লিগ মানেই ছিল দিকপাল ফুটবলারের মেলা। সমর্থকদের উন্মাদনা, মাঠ ভর্তি দর্শক, সারা দেশে চর্চা— সব মিলিয়ে এটি ছিল ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা। কিন্তু আজ? ফুটবলার নেই, বিপণন নেই, সম্প্রচার নেই, সমন্বয় নেই, এমনকি সময়সূচিও নেই। অথচ লিগ এখনও চলছে। কেন? সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ময়দানজুড়ে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক, গত বারের লিগের চ্যাম্পিয়ন এখনও ঘোষিত হয়নি। ভবানীপুর ও ডায়মন্ড হারবার ওয়াকওভার দেওয়ায় ইস্টবেঙ্গলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল আইএফএ। কিন্তু ডায়মন্ড হারবার আদালতে মামলা করে, যার ফলে লিগের ফলাফল আটকে যায়। শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এর মধ্যেই নতুন মরসুম শুরু হয়ে গ্রুপ পর্বও শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পুরনো চ্যাম্পিয়নের নাম আজও অজানা। এমন দৃশ্য বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না।
কলকাতা লিগ কি আদৌ আর গুরুত্ব পাচ্ছে? নাকি এটি পরিণত হয়েছে কেবল ‘খেলতে হয় বলে খেলা’র প্রতিযোগিতায়? ময়দানের অনেকেই মনে করেন, সমস্যার শুরু অনেক আগেই। ডায়মন্ড হারবারের মতো নতুন ক্লাবের আগমন এবং আদালতের লড়াই হয়তো সাম্প্রতিক সমস্যার কারণ, কিন্তু মূল অবনতি শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০১৪ সালে, আইএসএল শুরু হওয়ার পর। ঝকঝকে আয়োজন, বিপুল অর্থ, তারকাখচিত দল— আইএসএল যত বেড়েছে, কলকাতা লিগ ততই হারিয়েছে আকর্ষণ। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের আনুষ্ঠানিক ভাবে আইএসএলে যোগদান লিগের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেয়। বড় ক্লাবগুলির কাছে লিগ এখন কেবল জুনিয়র দলের অনুশীলনের জায়গা। সিনিয়র ফুটবলাররা আইএসএলের চুক্তির কারণে খেলেন না, আর খেলতেও চান না। ফলে শুভাশিস বসু বা প্রীতম কোটালের মতো তারকাদের আর দেখা যায় না কলকাতা লিগে।
অন্যদিকে, মাঠের সমস্যাও রয়েছে। কলকাতা লিগের বেশির ভাগ ম্যাচ হয় ব্যারাকপুর, কল্যাণী বা নৈহাটিতে। কলকাতা ময়দান থেকে প্রতিযোগিতা সরে যাওয়ায় দর্শকসংখ্যাও কমেছে। মোহনবাগান কর্তারা বলেন, ক্রিকেট ও হকির কারণে মাঠ দেওয়া সম্ভব হয় না। আইএফএ অবশ্য দাবি করে, জেলায় খেলা ছড়িয়ে দেওয়াও তাদের দায়িত্ব।
তবে লিগের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হল বিপণন ও সম্প্রচারে। আগে অন্তত প্রধান ম্যাচগুলো টিভিতে সম্প্রচারিত হতো। এখন একমাত্র ভরসা বেসরকারি অ্যাপ, যা নিয়েও অসংখ্য অভিযোগ— খারাপ ক্যামেরা, দুর্বল ধারাভাষ্য, তবুও মোটা সাবস্ক্রিপশন ফি। সচিবের যুক্তি, এখন অ্যাপের যুগ, টাকা দিয়েই খেলা দেখতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে— এমন নিম্নমানের সম্প্রচারে কে আগ্রহী হবে?
উপরে উপরে আরও সমস্যা দেখা যায় সূচি নিয়েও। কোনও নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার নেই, ম্যাচের তারিখ বদলে যায় বারবার। একাধিক বার বড় ক্লাব মাঠে দল নামায়নি, কখনও বকেয়া টাকা, কখনও অসুবিধাজনক সূচির অজুহাতে। আইএফএ যদিও সব দোষ মানতে নারাজ।
আজ অবস্থা এমন যে, একে বিশ্বের একমাত্র ফুটবল লিগ বলা যায়, যেখানে পুরনো চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ হওয়ার আগেই নতুন মরসুম শুরু হয়ে যায়। ঐতিহ্য আর আবেগে ভর করে টিকে থাকা কলকাতা লিগ আজ হারিয়েছে জৌলুস। প্রশ্ন উঠছে— আইএফএ কি সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারবে? নাকি কালের নিয়মে এই প্রাচীন প্রতিযোগিতা কেবল ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই পাবে?
ওড়িশায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির তল্লাশি, ১৩৯৬ কোটির প্রতারণা মামলায় উদ্ধার কোটি টাকার সম্পদ