অকপট সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়
সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়— কবি, লেখক এবং চিত্রনাট্যকার। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি নারীদের গল্পই বলতে চেয়েছেন। তাঁর লেখা ‘নষ্টনীড়’, ‘উত্তরণ’, ‘লজ্জা’র মতো সিরিজে ফুটে উঠেছে নারীদের সংগ্রাম, সমাজের চোখে তাঁদের লড়াই। সাহিত্য থেকে সিনেমার জগতে তাঁর যাত্রা যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি সাহসীও।
কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর লেখালিখি। “ছবির জন্য লিখব, কখনও ভাবিনি,” বললেন সম্রাজ্ঞী। চাকরি করতে করতেই তিনি পেলেন ‘মুখার্জিদার বৌ’ ছবির সংলাপ লেখার সুযোগ। সেখান থেকেই শুরু। ধীরে ধীরে নারীদের গল্পই হয়ে উঠল তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। তবে সম্রাজ্ঞী বলেন, “নারী-পুরুষ উভয়ের গল্প বলার অধিকার আমার আছে। কিন্তু সমাজে নারীদের জীবনের গল্প বলা জরুরি, কারণ সেগুলো প্রায়শই বলা হয় না।”
নারী-কেন্দ্রিক ছবিগুলিও সফল হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে। ‘ব্রহ্মা জানে’, ‘ফাটাফাটি’ বা ‘লজ্জা’— প্রতিটি প্রজেক্টই দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এমনকি বক্স অফিসে ব্যর্থ ‘বৌদি ক্যান্টিন’-ও ওটিটিতে বিপুল সাড়া পেয়েছিল।
নারী-অধিকার এবং সমাজের ভেতরে থাকা ভণ্ডামি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তীক্ষ্ণ। সম্রাজ্ঞী মনে করেন, শহরে নারীর সমস্যাগুলো শুধু ‘প্যাকেজিং’-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে। তিনি বলেন, “শহরে হেনস্থা আছে, গার্হস্থ্য হিংসা আছে, শুধু একটু মোড়ক দেওয়া। গ্রামে সেটা খোলামেলা।” মৌখিক হেনস্থাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তিনি বলেন, কারণ তা প্রমাণ করা কঠিন। “মেয়েদের আইন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। আর্থিক স্বনির্ভরতা জরুরি, তবে তাতেও হেনস্থার ভয় থাকে,” সতর্ক করলেন তিনি।
বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে সমাজের নীরবতা, নারীর পোশাক বা শরীর নিয়ে অযথা সমালোচনা— এসব নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে সম্রাজ্ঞীর। তিনি বলেন, “সমাজ এখনও মহিলাদের চেহারা ও পোশাকের বিচার করে। বয়সে দেরিতে বিয়ে করলেও কটাক্ষ করা হয়, কম বয়সে করলেও।” ঋতুস্রাব নিয়ে ছুতমার্গকেও তিনি লজ্জাজনক বলে মনে করেন।
কর্মক্ষেত্রেও তিনি সূক্ষ্ম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। “পুরুষ সহকর্মীরা আলাদা সুবিধা পেতেন। আমার ক্ষেত্রে তা হয়নি। এখনও মহিলাদের থেকে নমনীয় আচরণ আশা করা হয়,” বলেন তিনি।
সম্পর্ক নিয়েও তাঁর ভাবনা স্পষ্ট। একাধিক সম্পর্ক থাকা বা বিয়ে ভাঙাকে তিনি সাহসের পরিচয় মনে করেন। “যাঁরা গোপনে সম্পর্ক রাখেন, তাদের চেয়ে যারা প্রকাশ্যে বলেন, তাঁদের বেশি সম্মান করি,” জানালেন সম্রাজ্ঞী। নতুন প্রজন্মের সম্পর্কের ধরণ নিয়েও তিনি বলেন, “এরা সৎ। আগেই বলে দেয় ভবিষ্যৎ নেই।”
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও সম্রাজ্ঞী অকপট। স্বামী অরূপ চক্রবর্তী রাজনীতিতে থাকলেও, সম্রাজ্ঞী নিজের স্বতন্ত্র মতামত বজায় রেখেছেন। “শুরুর দিকে অসুবিধা হত। এখন বোঝাপড়া ভাল। আমাদের মতান্তরও হয়, কিন্তু তা সম্পর্কের সমস্যার কারণ হয় না।”
তবে শাসকদলের নেতার স্ত্রী হওয়ায় কটাক্ষের শিকার হয়েছেন তিনি। “অনেকে বলেছে, সুবিধা নিয়েছি। কিন্তু আমি কিছুই নিইনি। চাইলে নিতে পারতাম, নিইনি। এখন এসব আর কানে তুলি না,” স্পষ্ট জবাব তাঁর।
রাজনীতিতে যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে সম্রাজ্ঞী বলেন, “আমি রাজনৈতিক মানুষ, কিন্তু দলীয় রাজনীতিতে নেই। আমার জীবন পরিকল্পিত নয়। আপাতত ফ্রিল্যান্সার হয়েই ভাল আছি।”
সম্রাজ্ঞীর গল্প বলার ধরন যেমন নির্ভীক, তেমনই সৎ। তাঁর লেখা শুধু বিনোদন দেয় না, সমাজের আয়নাও তুলে ধরে।
ওড়িশায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে ইডির তল্লাশি, ১৩৯৬ কোটির প্রতারণা মামলায় উদ্ধার কোটি টাকার সম্পদ