ভারত মহাসাগরে চিনা নৌবাহিনীর গুপ্তচরবৃত্তি!
ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে নতুন করে শুরু হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার ধরা পড়েছে চিনা গুপ্তচর জাহাজের উপস্থিতি, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি। অভিযোগ উঠছে, সমুদ্রতলের মানচিত্র তৈরি করে ভবিষ্যতে কৌশলগত আঘাত হানার পরিকল্পনা করছে বেজিং।
সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে দেখা যায় চিনা গবেষণা জাহাজ ‘জিয়াং ইয়াং হং ০৩’–কে। ভারতের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের (EEZ) কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় এই জাহাজকে। আন্তর্জাতিক আইনে EEZ–এর সম্পদ এবং কার্যকলাপের উপর ভারতের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। সেখানেই চিনা উপস্থিতি যে সন্দেহ জাগাবে, তা স্বাভাবিক। যদিও বেজিংয়ের দাবি, এগুলো পরিবেশ ও জলবায়ু গবেষণার জন্য ব্যবহৃত জাহাজ। কিন্তু ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা একে নিছক গুপ্তচরবৃত্তি বলেই মনে করছেন।
তাদের মতে, সমুদ্রতলের মানচিত্র হাতে এলে চিনা ডুবোজাহাজ গোপনে প্রবেশের নতুন রাস্তা তৈরি করতে পারবে। এমনকি আন্দামান–নিকোবর, লক্ষদ্বীপ বা ভারতের পূর্ব-পশ্চিম উপকূলে থাকা নৌঘাঁটিতে অতর্কিতে হামলার পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। শুধু তাই নয়, ভারত মহাসাগরের সমুদ্রতলে থাকা টেলিযোগাযোগ কেবলও চিন চাইলে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—এমন হলে ভারতের ইন্টারনেট এবং যোগাযোগব্যবস্থা একেবারেই থমকে যেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত মহাসাগরে গুপ্তচরবৃত্তির পিছনে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। ম্যাঙ্গানিজ, নিকেল, তামা ও কোবাল্টের মতো মূল্যবান ধাতু এবং বিপুল পরিমাণ তেলের খোঁজে চোখ রেখেছে বেজিং। একইসঙ্গে মাছ ধরার ক্ষেত্রেও ভারত মহাসাগর চিনের কাছে বড় লক্ষ্য। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় বেজিং চায় আরও বেশি মাছ শিকার করতে, আর ভারত মহাসাগর সেই সুযোগ এনে দিতে পারে।
চিন ইতিমধ্যেই “স্ট্রিং অফ পার্লস” নীতির মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, পাকিস্তানের গ্বদর, জিবুতির মতো জায়গায় নৌঘাঁটি গড়ে তুলেছে। মলদ্বীপের উপরও তাদের প্রভাব বাড়ছে। অন্যদিকে ভারতও হাত গুটিয়ে বসে নেই। পাল্টা কৌশল হিসেবে নয়াদিল্লি ইরানের চাবাহার বন্দর তৈরি করেছে, যা থেকে সহজেই নজর রাখা যায় গ্বদরের উপর। পাশাপাশি ওমান, সেশলস, মরিশাস, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে ভারতীয় নৌঘাঁটি তৈরির কাজও এগোচ্ছে।
ভারতের নৌবাহিনীর হাতে উন্নত রাডার ব্যবস্থা, কোস্টাল সার্ভেলেন্স সিস্টেম এবং গুরুগ্রামের মেরিটাইম ফিউশন সেন্টারের মতো অবকাঠামো থাকায় চিনা জাহাজের গতিবিধির উপর নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবুও সংখ্যার বিচারে বেজিং অনেক এগিয়ে—চিনের হাতে যেখানে রয়েছে ৬৪টি বিশেষ গুপ্তচর জাহাজ, ভারতের হাতে রয়েছে মাত্র ১৪টি।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে ভারত ও চিনের সংঘাত ঘটতে পারে হয় সীমান্তে, নয়তো ভারত মহাসাগরে। সেই প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই দুই পক্ষই নিচ্ছে। ভারত মহাসাগরের উপর প্রভাব হারালে নয়াদিল্লির ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। অপরদিকে, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ পেলে চিন শুধু ভারতের উপর চাপ তৈরি করতে পারবে না, বরং গোটা এশিয়ার বাণিজ্যপথও নিজের কব্জায় আনতে সক্ষম হবে।
সুতরাং স্পষ্ট—ভারত মহাসাগর ঘিরে শুধু ভূখণ্ড নয়, প্রাধান্য ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়েও এক গভীর লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। ভারত ও চিনের মধ্যে এই অদৃশ্য টানাপোড়েন একদিন প্রকাশ্য সংঘাতে গড়াবে কি না, সেটাই এখন সময়ের অপেক্ষা।