দিল্লিতে হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্রের একাংশ ভেঙে বিপর্যয়
দিল্লির পূর্ব নিজামুদ্দিনের ঐতিহাসিক হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্রে ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। শুক্রবার বিকেলে আচমকাই ভেঙে পড়ল ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত এই সমাধিক্ষেত্রের একাংশ। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত হয়ে উঠল স্থাপত্যের প্রাচীন প্রাঙ্গণ। জানা গিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় অন্তত পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও কয়েক জন ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
শুক্রবার বিকেল প্রায় ৪.৩০ টার সময় সমাধিক্ষেত্রের একটি গম্বুজের অংশ আচমকা ধসে পড়ে। তার সঙ্গে ভেঙে যায় দরগার ছাদ ও সংলগ্ন প্রাচীরের কিছুটা অংশ। সেই ধ্বংসস্তূপেই আট থেকে ন’জন চাপা পড়েন বলে প্রথমে জানায় দিল্লির দমকল বিভাগ। পরে উদ্ধারকর্মীরা টানা তল্লাশি চালিয়ে পাঁচ জনের দেহ উদ্ধার করেন। এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে কয়েক জন আটকে আছেন বলে আশঙ্কা জোরালো। ঘটনাস্থলে দমকলের পাঁচটি বাহিনী উদ্ধারকাজে নেমেছে।
পর্যটকদের আতঙ্ক
ছুটির দিন হওয়ায় বিকেলে সমাধিক্ষেত্রের ভেতরে বহু পর্যটক ছিলেন। আচমকা গম্বুজ ভেঙে পড়তেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে চিৎকার ও বিশৃঙ্খলা। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকেই জানান, ভেঙে পড়ার শব্দ এতটাই প্রবল ছিল যে মুহূর্তে আতঙ্ক ছড়িয়ে যায় চারদিকে। পর্যটকদের মধ্যে কয়েক জন আহত হয়েছেন বলেও খবর। তাঁদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মোগল ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব
হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র শুধু দিল্লির নয়, গোটা ভারতের ঐতিহ্যের গর্ব। দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুনের এই সমাধি মোগল যুগের প্রথম ‘উদ্যান সমাধিক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত। ১৫৬২ সালে সম্রাটের স্ত্রী হামিদা বানু বেগম বুখারার স্থপতি মির্জা গিয়াসের তত্ত্বাবধানে এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। বেলেপাথরের তৈরি এই মহৎ স্থাপত্য পরে তাজমহলেরও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
মোগল যুগে বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নির্মিত হলেও, হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্রের বিশেষ স্থান রয়েছে। পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে বাবর দিল্লির সিংহাসন দখল করেছিলেন। বাবরের অকালমৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন। যদিও শের শাহ সুরির কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে একসময় দেশ ছাড়তে হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি পুনরায় দিল্লি দখল করেন। তাঁর মৃত্যুর পরই তৈরি হয় এই সমাধিক্ষেত্র, যা আজও ভারতীয় স্থাপত্যকলার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উদ্বেগ বাড়ছে সংরক্ষণ নিয়ে
হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র ১৯৯৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। কিন্তু এত মূল্যবান একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যের অংশ ভেঙে পড়া নিয়ে এখন উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছর বছর চলা মেরামতির কাজ সত্ত্বেও অনেক সময় সঠিকভাবে সংরক্ষণ না হওয়ার কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটে। দিল্লির পুরাতত্ত্ব দফতর ও কর্তৃপক্ষ এখন এ নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।
উপসংহার
ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়ানো হুমায়ুনের সমাধিক্ষেত্র আজ বিপর্যয়ের মুখে। পর্যটন ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে শুধু দিল্লি নয়, গোটা বিশ্বের দৃষ্টি এখন এই স্থাপত্যে। প্রাণহানির ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে—এই মহামূল্যবান স্থাপত্য কি যথাযথ সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ পাচ্ছে? ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ানো এই সমাধিক্ষেত্রকে আগামিদিনে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই দিকেই এখন সকলের দৃষ্টি।