‘ডলার যুদ্ধে’ নামল উত্তর কোরিয়া!
তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আর পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা—এই তিনের ঘূর্ণিতে ঘুরপাক খাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। কিম জং উনের নেতৃত্বাধীন এই দেশ যে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আরও শক্তিশালী করতে মরিয়া, তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এবার উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—পশ্চিমা বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি বাজারে জাল পরিচয়ে কাজ করে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে উত্তর কোরিয়ার কর্মীরা, আর সেই টাকা ঢালাওভাবে ঢুকছে কিমের পারমাণবিক কর্মসূচিতে।
সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সরকার হাজার হাজার দক্ষ আইটি কর্মীকে বিদেশে পাঠিয়েছে, যাঁরা ভুয়ো পরিচয়ে আমেরিকা ও ইউরোপের বহু সংস্থায় চাকরি করছেন। এঁদের কাজের মূল উদ্দেশ্য—বিদেশি মুদ্রা সংগ্রহ করে সরাসরি সরকারের কোষাগারে পৌঁছে দেওয়া।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি’-তে এক উত্তর কোরীয় নাগরিক (নাম গোপন রাখা হয়েছে) জানিয়েছেন, তিনি নিজে বছরের পর বছর ধরে ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে আমেরিকার বিভিন্ন সংস্থায় ‘রিমোট’ কাজ করেছেন। শত শত জাল আইডি, ভুয়ো লিঙ্কডইন প্রোফাইল, মিথ্যা অভিজ্ঞতার সারি আর নিখুঁতভাবে প্রস্তুতকৃত সাক্ষাৎকারের চিত্রনাট্য—সবকিছু মিলিয়ে ছিল এক নিখুঁত প্রতারণার জাল।
জানা গেছে, এসব কর্মীরা মাসে গড়ে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত আয় করতেন। কিন্তু তাঁদের সেই উপার্জনের ৮৫ শতাংশই তুলে দিতে হতো সরকারের হাতে। আর এই টাকা দিয়েই এগোচ্ছিল কিমের পরমাণু কর্মসূচি।
এই অপারেশন চালানোর জন্য তাঁদের চিন, রাশিয়া কিংবা অন্যান্য তৃতীয় দেশে পাঠানো হত, যাতে সরাসরি উত্তর কোরিয়ার নাম না উঠে আসে। কোভিড অতিমারির সময়, যখন বিশ্বের অধিকাংশ সংস্থা ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ শুরু করে, তখনই সুযোগ নেয় উত্তর কোরিয়া। নিরাপদ দূরত্বে বসেই জাল পরিচয়ে তারা ঢুকে পড়ে আমেরিকার চাকরি বাজারে।
আরও ভয়ংকর তথ্য সামনে এসেছে এফবিআই-এর তদন্তে। একজন মার্কিন মহিলা ক্রিস্টিনা চ্যাপম্যান স্বীকার করেছেন, তিনি উত্তর কোরিয়ার হয়ে একাধিক ভুয়ো প্রোফাইলধারী কর্মীকে চাকরি পেতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর ঠিকানায় আসে ৯০টিরও বেশি ল্যাপটপ, যেগুলি পরে বিদেশে পাঠিয়ে কর্মীদের যুক্ত করা হত বিভিন্ন সংস্থায়। তিনি কর্মীদের হয়ে বেতন সংগ্রহ করে তা সরাসরি উত্তর কোরিয়ার অ্যাকাউন্টে পাঠাতেন।
শুধু চাকরি নয়, উত্তর কোরিয়ার সরকার ক্রিপ্টোকারেন্সির দুনিয়াতেও হ্যাকিং করে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ‘ল্যাজারাস গ্রুপ’ নামে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী, যাদের সরকারি সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়, তারা জাপানের একটি ক্রিপ্টো সংস্থা থেকে একাই ৩০ কোটি ডলার চুরি করেছে।
২০২৪ সালে এক মার্কিন আদালতে ১৪ জন কোরীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছে, যারা ছ’বছর ধরে আমেরিকান সংস্থায় ছদ্মবেশে কাজ করে প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। চলতি বছর আরও ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যারা আবারও জাল ডকুমেন্টে চাকরি করছিলেন একটি বড় ক্রিপ্টো ফার্মে।
আজকের দিনে যুদ্ধ শুধু অস্ত্রে হয় না—চাকরি বাজার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এমনকি কম্পিউটারের কীবোর্ডও হয়ে উঠছে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। আর সেই যুদ্ধে কিম জং উনের উত্তর কোরিয়া হয়তো সবচেয়ে নীরব, অথচ ভয়ঙ্কর খেলোয়াড়!
দোকানের মশলার বদলে ঘরেই বানিয়ে নিন মাংসের স্বাদ বাড়ানোর জাদুমন্ত্র