ভোর হতেই ‘বৃদ্ধ’ হয়ে যেতেন দেব!
তিনি তখন একেবারে তরুণ—৩৩ বছরের টানটান চেহারা, মেদহীন শরীর, কালো ঘন চুল। অথচ, পর্দায় তাঁকে দেখা যাবে ৭৫ বছরের এক বৃদ্ধের চরিত্রে! মুখে বলিরেখা, চোখে ভারী চশমা, চলাফেরায় ধীরতা, গলায় বার্ধক্যের কম্পন—সবই থাকবে নিখুঁতভাবে। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন অভিনেতা দেব, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি ‘ধূমকেতু’–তে।
চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে দেবকে যে বয়সে পৌঁছতে হয়েছিল, তার জন্য শুধুমাত্র অভিনয় দক্ষতা যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন ছিল নিখুঁত রূপান্তরের। আর সেই কঠিন কাজটিই সফলভাবে করেছিলেন বলিউডের খ্যাতনামা প্রস্থেটিক মেকআপ শিল্পী বিক্রম গায়কোয়াড়।
প্রতিদিনের প্রস্তুতি শুরু হত মধ্যরাতেই। ঠিক রাত ১টা-দেড়টার মধ্যে খেয়ে নিতেন ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস—যা পেট ভরে শক্ত খাবার। কারণ, একবার মেকআপ শুরু হলে আর কিছু খাওয়া যাবে না। তারপর, ভোর ৩টে থেকে শুরু হত প্রস্থেটিক মেকআপ। পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে সেই জটিল রূপান্তরের কাজ। সকাল ৮টা নাগাদ ক্যামেরার সামনে যখন দেব দাঁড়াতেন, তখন আর কেউ চিনে উঠতে পারতেন না তাঁকে।
কিন্তু এই রূপ বদলের পেছনে যে কষ্ট লুকিয়ে, তা দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে বসে থাকা, যেন মেকআপ নড়েচড়ে না যায়। মেকআপ বসাতে যাতে একটু আরাম হয়, তার জন্য প্রযোজক রানা সরকার কলকাতা থেকে একটি বিশেষ চেয়ার নিয়ে গিয়েছিলেন নৈনিতালে।
আরও একটা চ্যালেঞ্জ ছিল—প্রতিদিন নতুন মেকআপ! প্রস্থেটিক রূপটান এক দিনের বেশি ব্যবহার করা যায় না, ফলে প্রতিদিনই নতুন করে মেকআপ করতে হত দেবকে। দিনে এই রূপটানের পিছনে খরচ হতো প্রায় দেড় লক্ষ টাকা।
শুধু চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ ফেললেই তো হয় না, চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে শরীরেও ভারিক্কি ভাব আনা জরুরি। দেব ছিলেন ছিপছিপে গড়নের। তাই তাঁর শরীরকে বৃদ্ধদের মতো ভারী দেখাতে ব্যবহার করা হয়েছিল মোটা পোশাক ও বিশেষ কস্টিউম। এই পোশাকগুলি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় চেহারা মেদবহুল দেখায়।
প্রস্থেটিক মেকআপে আরও একটা সমস্যা থাকে—ত্বক নিঃশ্বাস নিতে পারে না। ত্বকে অক্সিজেন না পৌঁছনোর ফলে চুলকানি, লালচে ভাব বা অ্যালার্জিও হতে পারে। অনেক অভিনেতাই এক সময়ের পর এতে আপত্তি জানান। কিন্তু দেব কোনো দিন টুঁ শব্দটিও করেননি। বরং শুটিং শেষে ইউনিটের ক্লান্তি কাটাতে নিজেই বলতেন, “চলো, একটু জঙ্গলে ঘুরে আসি।”
এই অদম্য পেশাদারিত্ব ও একাগ্রতা শুধু নায়ক নয়, একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় দেয়। দেবের এই নিষ্ঠা দেখেই পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, “নায়ক নয়, ওরকম অভিনেতা পাওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার।”