রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ও আজকের স্মৃতি!
১৯৯১ সালের ২১ মে। রাতটা ভারতের ইতিহাসে চিরকাল এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। ঠিক সেই রাতে তামিলনাড়ুর শ্রীপেরুম্বুদুরে জনসভায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে প্রাণ হারান দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। একটি গারল্যান্ড দেওয়ার মুহূর্তেই বিস্ফোরণ—নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঘটে ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
এই ঘটনায় শুধু এক জন ব্যক্তি প্রাণ হারাননি, ধ্বংস হয়েছিল একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশ। আজ, এত বছর পরও, এই ঘটনা বারবার ফিরে আসে—কখনও সংবাদে, কখনও প্রবন্ধে, আবার কখনও নতুন প্রজন্মকে তা জানাতে তৈরি হয় ওয়েব সিরিজ।
সম্প্রতি এমনই এক ওয়েব সিরিজ ‘The Hunt’ আবার তুলে ধরেছে সেই ভয়াবহ রাত ও তার পরবর্তী তদন্ত পর্ব। রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক হত্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি, এলটিটিইর জঙ্গিবাদ, এবং একাধিক দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতা।
সেই রাতটা ছিল এক আশাবাদের রাত। রাজীব গান্ধী আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু হাসিমুখে জনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়ই তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত গোনা শুরু হয়। বিস্ফোরণে শুধু রাজীব নয়, মারা যান আরও অনেক নিরীহ মানুষ—সংবাদকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তাকর্মী।
পরবর্তী তদন্তে উঠে আসে এলটিটিইর নাম—তামিল টাইগার বাহিনীর এক মহিলা সদস্য আত্মঘাতী হামলায় রাজীব গান্ধীকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে যা ঘটেছে, তার নানা দিক আজও বিতর্কিত। গোয়েন্দা সংস্থার ত্রুটি, নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা—সব মিলিয়ে ঘটনার গভীরতা ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট।
ওয়েব সিরিজটি সেই জটিলতাগুলোকেই পর্দায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। শুধুই থ্রিলার নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক ঐতিহাসিক দলিল, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি সিদ্ধান্ত, একটি ভুল বা একটুখানি অবহেলা কত ভয়ানক হতে পারে।
এই প্রজন্মের অনেকেই রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি বহন করেন না। তাই এমন কাজ সময়ের দাবি। কেবল ইতিহাস জানার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক থাকার পাঠ শেখানোর জন্য। ‘The Hunt’ সেই শিক্ষাই দিতে চায়।
রাজনৈতিক সহিংসতা কখনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এক জন নেতার মৃত্যুতে হয়তো সাময়িক উদ্দেশ্য সাধিত হয়, কিন্তু ক্ষত তৈরি হয় বহু প্রজন্মের হৃদয়ে। রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর মতো ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঘৃণার চেয়ে বড় শক্তি ভালোবাসা, এবং প্রতিহিংসার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহনশীলতা।
আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে, যখন রাজনৈতিক মতভেদ, মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা ধর্মীয় বিভাজনের প্রশ্নে সমাজ পুনরায় দ্বিধাগ্রস্ত, তখন এই ধরণের ঘটনা ও তার শিল্পভিত্তিক উপস্থাপন আমাদের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলে।