বালোচিস্তানে পাক সেনার অভিযান!
বালোচিস্তানে জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন অপহরণের ঘটনায় সেনা অভিযানের সমাপ্তি ঘোষিত হলেও, পণবন্দি মুক্তি ও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং সরকারের দেওয়া তথ্য একরকম, আর স্বাধীনতাপন্থী বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) দাবি অন্যরকম। ফলে এই ঘটনাকে ঘিরে ধোঁয়াশা ও বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।
কতজন যাত্রী উদ্ধার? কারা মারা গেছেন?
পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকালে কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেসে মোট ৪৪০ জন যাত্রী ছিলেন। বিদ্রোহীদের কবল থেকে ৩০০ জনেরও বেশি যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, নির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। হতাহতের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। পাক সেনার দাবি, ৩৩ জন বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয়েছে, নিহত হয়েছেন ২১ জন যাত্রী এবং ৪ জন আধাসেনা সদস্য।
কিন্তু বিএলএ জানিয়েছে, তাদের ৩৩ জন যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাদের মতে, পাক সেনার হামলায় অন্তত ৫০ জন পণবন্দি নিহত হয়েছেন। সত্যতা যাচাই করা না গেলেও, কোয়েটার রেলস্টেশনে ২০০টি কফিন মজুত করার খবর এই দাবিকে উসকে দিয়েছে।
বিদ্রোহীদের শর্ত ও সেনার প্রতিক্রিয়া
বালোচ বিদ্রোহীরা দাবি করেছিল, পাকিস্তান এবং চীন যেন বালোচিস্তান থেকে নিজেদের প্রভাব তুলে নেয় এবং বালোচ রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই দাবি মানেনি ইসলামাবাদ। এর পরিবর্তে, সেনার ‘স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ’ (এসএসজি) এবং ফ্রন্টিয়ার কোর কমান্ডোরা অভিযান চালায়।
অভিযান শুরুর পর, রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কোবরা হেলিকপ্টার থেকে বোমাবর্ষণ করে। মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থান নেওয়া বিদ্রোহীদের নির্মূল করতেই ‘থার্মাল ইমেজিং সেন্সর’ ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। বুধবার সকালে সেনারা মাশকাফের ১৬টি সুড়ঙ্গ বিদ্রোহী-মুক্ত করার দাবি করে, তবে ৮ নম্বর সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে পুরো দিন কেটে যায়।
বাঁচানো গেল কি সব পণবন্দিকে?
পাক সেনা অভিযানে শেষ পর্যন্ত কতজন পণবন্দি জীবিত উদ্ধার হল, তা নিয়ে সঠিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিএলএর দাবি, তাদের যোদ্ধারা ‘সুইসাইড ভেস্ট’ পরে ছিলেন, যা উদ্ধারের কাজকে কঠিন করে তোলে। একাংশের দাবি, পাক সেনা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের শেষ করে দ্রুত কমান্ডো হামলা চালিয়ে সাফল্য পায়।
কিন্তু এই ‘সাফল্য’ কতটা বাস্তব, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, অপহরণের পর বিদ্রোহীরা প্রায় ২০০ জন নারী, শিশু ও বালোচ জনগোষ্ঠীর মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল। ফলে পাক সরকারের দাবিকৃত ২১ জন মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে।
পাকিস্তানে বালোচিস্তানের বিদ্রোহ: শেষ হবে কবে?
বালোচ বিদ্রোহীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তানের ‘পাঞ্জাবী আধিপত্যবাদ’ তাদের প্রতি অবিচার করছে। তারা চায় নিজেদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, আর এজন্যই তারা পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে।
কিন্তু এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, পাকিস্তানি সেনার শক্তি ও অভিযানের কৌশল যতই আধুনিক হোক, বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর দমন এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। বরং, এমন অভিযান নতুন করে ক্ষোভ ও প্রতিরোধ বাড়িয়ে তুলতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এই লড়াইয়ের সমাধান হবে কূটনৈতিক পথে, নাকি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলতেই থাকবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।