গৌতম আদানি এবং মুকেশ আম্বানি
২০২৪ সালের এক অপ্রত্যাশিত পরিণামে ভারতীয় দুই অন্যতম ধনী ব্যক্তি গৌতম আদানি এবং মুকেশ আম্বানি ব্লুমবার্গের প্রথিতযশা $১০০ বিলিয়ন ক্লাব থেকে বাদ পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার ধনীদের তালিকায় শীর্ষে থাকা এই দুই শিল্পপতি এখন বড় ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা তাদের সম্পদকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। যেখানে মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ধীরগতি এবং ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর সমস্যায় ভুগছে, সেখানে গৌতম আদানির সাম্রাজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (DoJ) তদন্তের মুখোমুখি, যা হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্টের ফলস্বরূপ আরও জটিল হয়েছে।
ভারতের শীর্ষ ধনীদের পতন
ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার ইনডেক্স (BBI)-এর তথ্য অনুযায়ী, মুকেশ আম্বানির মোট সম্পদ, যা ২০২৪ সালের জুলাই মাসে $১২০.৮ বিলিয়ন ছিল, তা ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে কমে $৯৬.৭ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। রিলায়েন্সের শক্তি এবং খুচরা ব্যবসায়ের দুর্বলতা, সঙ্গে কোম্পানির ঋণ বৃদ্ধির কারণে এই পতন ঘটেছে। তার সম্পদ সংকোচন সত্ত্বেও, রিলায়েন্সের টেলিকম এবং খুচরা ব্যবসায় সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চলছিল।
অন্যদিকে, গৌতম আদানি আরো বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। জুন মাসে তার মোট সম্পদ ছিল $১২২.৩ বিলিয়ন, যা এখন কমে $৮২.১ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। এই পতনের কারণ মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তদন্ত, যা নভেম্বর মাসে শুরু হয়েছিল এবং আদানি গ্রুপের কার্যক্রম সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর আগেই, হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ রিপোর্টে আদানি গ্রুপকে প্রতারণা এবং শেয়ারManipulation-এ অভিযুক্ত করা হয়েছিল। আদানি যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও এর পরিণতি ছিল ব্যাপক, যার ফলে তার কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য এবং বিনিয়োগকারীদের বিশ্বাস হ্রাস পেয়েছে।
ভারতের ধনীদের ভিন্ন ভাগ্য
এছাড়া, মুকেশ আম্বানি এবং গৌতম আদানির সংকট সত্ত্বেও, ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা ২০২৪ সালে তাদের সম্পদের বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছেন। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ২০ ধনী ব্যক্তি ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মোট $৬৭.৩ বিলিয়ন বৃদ্ধি করেছেন। এই বৃদ্ধির মধ্যে সবচেয়ে বড় লাভজনক ব্যক্তি হলেন:
- শিব নাদার (টেক মোগল): $১০.৮ বিলিয়ন বৃদ্ধি
- সাবিত্রী জিন্দাল (স্টিল টাইকুন): $১০.১ বিলিয়ন বৃদ্ধি
এই বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির দৃঢ়তা এবং অন্যান্য সেক্টরের সফলতা প্রদর্শন করে, যদিও কিছু বৃহৎ গ্রুপ ব্যবসায়িক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা এবং উদীয়মান হুমকি
আম্বানি এবং আদানির চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র তাদের বর্তমান ব্যবসায়িক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রিপোর্টে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে:
- এলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক: মাস্কের স্যাটেলাইট ব্রডব্যান্ড পরিষেবা ভারতের টেলিকম বাজারে প্রবেশ করলে, এটি রিলায়েন্স জিওর আধিপত্যে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
- মার্কিন রাজনীতির অনিশ্চয়তা: ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন প্রশাসন বৈশ্বিক বাজারে এক নতুন অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ভারতীয় কোম্পানিগুলোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী পরিবার: ভারতীয়রা কোথায় দাঁড়িয়ে?
যদিও আম্বানি এবং আদানি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তবে আম্বানি পরিবার এখনও বিশ্বের ধনী পরিবারের তালিকায় অবস্থান ধরে রেখেছে। ব্লুমবার্গের ২০২৪ সালের শীর্ষ ধনী পরিবারদের তালিকায়, ওয়ালমার্টের ওয়ালটনরা $৪৩২.৪ বিলিয়ন সম্পদ নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করেছে, যা এলন মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতের পক্ষ থেকে, আম্বানি পরিবার অষ্টম স্থান অধিকার করেছে, আর শাপূরজি পলোনজি পরিবারের মিস্ট্রিরা ২৩ তম স্থান দখল করেছে। উল্লেখযোগ্য যে, গৌতম আদানি এই তালিকায় স্থান পাননি, কারণ এটি প্রথম প্রজন্মের সম্পদ এবং একক উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি অন্তর্ভুক্ত করে না।
উপসংহার
২০২৪ সাল গৌতম আদানি এবং মুকেশ আম্বানির জন্য একটি কঠিন বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও তারা ব্লুমবার্গের $১০০ বিলিয়ন ক্লাব থেকে বাদ পড়েছেন, তবুও ভারতের অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব এবং অবদান অপরিসীম। আগামী মাসগুলো তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা তাদের ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার এবং বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের স্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবেন।