আরাকান আর্মির দখলে গুরুত্বপূর্ণ শহর!
মায়ানমারের জুন্টা সরকার বর্তমানে এক ভয়াবহ সঙ্কটের মুখোমুখি। বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি মংডো শহরের শেষ সেনাঘাঁটি দখল করেছে। এই সেনাঘাঁটির দখল নিয়ে তারা এখন মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে। মংডো দখল করার পাশাপাশি, আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সঙ্গে থাকা ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তও তাদের অধীনে এনেছে।
মংডো দখল: কী ঘটেছে?
আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইং থুখা নিশ্চিত করেছেন যে, তারা মংডোর সেনাঘাঁটি দখল করতে সফল হয়েছে। এই অভিযানের সময় সেনাঘাঁটির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থুরেইন তুনকে বন্দি করা হয়। জানা গেছে, আক্রমণের পর কিছু সেনা প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করলেও তাদের অনেকেই আটক হয়েছেন। আরাকান আর্মি নাফ নদীতে পরিবহণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তারা দাবি করছে, সেনা ও স্থানীয় মুসলিমরা নৌকায় বাংলাদেশে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
আরাকান আর্মি: তাদের পরিচয়
আরাকান আর্মি রাখাইন সম্প্রদায়ের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যা ২০০৯ সালে ছাত্রনেতা ত্বোয়ান মারত নাইং-এর নেতৃত্বে গঠিত হয়। শুরুতে তারা উত্তর মায়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি’র সহায়তায় কাজ শুরু করেছিল। এরা রাখাইন প্রদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে এবং এর ফলে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের বারবার সংঘাত হয়েছে।
২০১৯ সালে রাখাইন প্রদেশের স্বাধীনতা দিবসে চারটি থানায় একযোগে হামলা চালায় আরাকান আর্মি। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘাত বাড়তে থাকে। বর্তমানে তারা রাখাইনের অধিকাংশ শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং মংডো দখলের মাধ্যমে তাদের শক্তি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাখাইনের কৌশলগত গুরুত্ব
রাখাইন প্রদেশ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের কক্সবাজারের সন্নিকটে অবস্থিত এই প্রদেশ মায়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় বাণিজ্য ও সামরিক কার্যক্রমের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ভারতের ‘কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে।
ভারতীয় প্রকল্পের উপর প্রভাব
রাখাইন প্রদেশে সংঘাতের ফলে ভারতের কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রকল্প কলকাতা থেকে মায়ানমারের সিতোই বন্দর পর্যন্ত সড়ক ও সামুদ্রিক সংযোগ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আরাকান আর্মি যখন পালেতওয়া শহর দখল করে, তখন থেকেই এই প্রকল্পের কাজ থমকে যায়। যদিও আরাকান আর্মি ও সেনা সরকার উভয়েই দাবি করেছে যে, তারা ভারতীয় প্রকল্পে কোনও সমস্যা সৃষ্টি করতে চায় না, বাস্তবে এই সংঘাত প্রকল্পটিকে ‘মৃতপ্রায়’ অবস্থায় নিয়ে গেছে।
মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ
২০২১ সালে মায়ানমারের সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের সংঘাত বেড়ে গেছে। আরাকান আর্মি, তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ), এবং মায়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) মিলে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করে। এই জোট মায়ানমারের সেনা সরকারের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে রাখাইন প্রদেশ মায়ানমারের গৃহযুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সরকারের প্রায় অর্ধেক এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে চলে গেছে। মংডো দখল এই অবস্থাকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি এভাবে চলতে থাকলে মায়ানমারের সরকার পতনের মুখোমুখি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ কী নির্দেশ করছে?
রাখাইন দখল মায়ানমারের গৃহযুদ্ধকে আরও তীব্র করে তুলেছে। মংডোর মতো কৌশলগত শহর বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়ায় সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে গেছে। ভারতের প্রকল্পগুলোর উপর এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে রাখাইনে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তি মায়ানমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।