বিশ্বের সবচেয়ে ছোট যুদ্ধ
যুদ্ধের ইতিহাসে বড় বড় যুদ্ধগুলির কথা আমরা সবাই জানি। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা অ্যাংলো-ফরাসি যুদ্ধ বছরের পর বছর ধরে চলেছে। এমনকি রোমান-পার্সিয়ান যুদ্ধ চলেছিল প্রায় ৬০০-৭০০ বছর। কিন্তু এমন একটি যুদ্ধও ইতিহাসে ঘটেছে যা শেষ হয়ে গিয়েছিল মাত্র ৩৮ মিনিটে। এটি হলো ১৮৯৬ সালের অ্যাংলো-জাঞ্জিবার যুদ্ধ। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ের যুদ্ধ।
১৮৯৬ সালের ২৭ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যেই এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। ইতিহাসের পাতায় এই যুদ্ধের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের এক অনন্য উদাহরণ।
যুদ্ধের পটভূমি
জাঞ্জিবার, পূর্ব আফ্রিকার তানজানিয়ার উপকূলে অবস্থিত একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপপুঞ্জ, একসময় নিজেকে স্বাধীন দেশ হিসেবে বিবেচনা করত। ১৪৯৯ সালে পর্তুগিজরা সেখানে বসতি স্থাপন করলেও, ১৬৯৮ সালে ওমানের সুলতানদের কাছে তাদের দখল হারায়। ১৮৫৮ সালে সুলতান মাজিদ বিন সইদ ওমান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জাঞ্জিবারকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশদের স্বীকৃতি পান।
১৮৯৬ সালে জাঞ্জিবারের ব্রিটিশপন্থী সুলতান হামাদ বিন থুওয়াইনি আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন। এরপর সুলতান হিসেবে খলিদ বিন বারগাশ ক্ষমতা দখল করেন। তবে ব্রিটিশরা চেয়েছিল তাঁদের অনুগত নেতা হামুদ বিন মহম্মদ সুলতান হন। খলিদ ব্রিটিশদের অনুমোদন ছাড়াই ক্ষমতা গ্রহণ করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
যুদ্ধের সূচনা
ব্রিটিশরা খলিদকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু খলিদ সেই নির্দেশ অমান্য করেন এবং লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নেন। ব্রিটিশ নৌবাহিনী তখন পাঁচটি যুদ্ধজাহাজ এবং প্রায় ১৫০ জন নৌসেনা নিয়ে জাঞ্জিবারে উপস্থিত হয়।
২৭ আগস্ট সকাল ৯টা নাগাদ ব্রিটিশ বাহিনী খলিদের প্রাসাদ লক্ষ্য করে গুলি চালানো শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই খলিদের বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। ব্রিটিশদের হামলায় খলিদের প্রায় ৫০০ অনুগত সেনা নিহত হয়। ব্রিটিশ বাহিনীর বোমাবর্ষণ এতটাই তীব্র ছিল যে খলিদের প্রাসাদ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
যুদ্ধের সমাপ্তি
সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে খলিদ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে জার্মান দূতাবাসে পালিয়ে যান। এরপর ব্রিটিশরা হামাদকে সুলতান হিসেবে ক্ষমতায় বসায় এবং জাঞ্জিবারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
যুদ্ধের প্রভাব
যদিও যুদ্ধটি খুবই স্বল্পস্থায়ী ছিল, এটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের একটি বড় উদাহরণ। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে কীভাবে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি তাদের স্বার্থ রক্ষায় অন্য দেশগুলির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে।
অ্যাংলো-জাঞ্জিবার যুদ্ধ ইতিহাসে ছোট হলেও এর তাৎপর্য অনেক। এটি শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়, বরং শক্তির প্রদর্শন এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি নিদর্শন।