নেশামুক্তি কেন্দ্রে তরুণীর মৃত্যু
ঠাকুরপুকুরের এক নেশামুক্তি কেন্দ্রে ২৮ বছরের তরুণী পৌলোমী ধরের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় সাত মাস পরে দু’জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। রিয়া চৌহান ও সাগরিকা ব্যাপারি নামে ওই দুই অভিযুক্তকে বুধবার আলিপুরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় বিচারকের আদালতে পেশ করা হলে তিন দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় প্রথম থেকেই পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল মৃতার পরিবার।
মৃত্যুর ঘটনা ও পরিবারের অভিযোগ
গত ৩১ মে রাতে নেশামুক্তি কেন্দ্রের শৌচাগার থেকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় উদ্ধার হয় পৌলোমীর দেহ। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পৌলোমীর বাবা দীপককুমার ধর বলেন, ‘‘নেশামুক্তি কেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী আবাসিকদের কোনও ওড়না বা বিপজ্জনক জিনিস রাখা নিষিদ্ধ। তাহলে মেয়ের কাছে ওড়না এল কীভাবে?’’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, মেয়ে যে ওড়না দিয়ে ফাঁস নিয়েছে, সেটি তার ছিল না।
পরিবারের দাবি, পৌলোমীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনার সিসি ক্যামেরার ফুটেজে মারধরের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশের তরফে শুধুমাত্র দু’টি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানো হয়েছে। সেখানে আরও ক্যামেরা থাকলেও তাদের ফুটেজ কেন গোপন রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন দীপক।
নেশার কবলে ও নেশামুক্তি কেন্দ্রের ভূমিকা
পৌলোমী ধরের জীবন শুরু হয়েছিল সফলতার সঙ্গে। ম্যানেজমেন্টের শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা শেষ করে তিনি নামী হোটেল ও বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করেন। কিন্তু কয়েকজন সহকর্মীর প্রভাবে নেশার জগতে পা রাখেন। প্রথমবার ২০১৯ সালে তাঁকে ঠাকুরপুকুরের এই নেশামুক্তি কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয়বার গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আবার তাঁকে ওই কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
পৌলোমীর পরিবার অভিযোগ করে, ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দেড় মাস তাঁদের মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ১১ মে শেষবার তাঁরা মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন। এরপর থেকে নেশামুক্তি কেন্দ্রের তরফে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা
মৃত্যুর পর পরিবার জানায়, পুলিশ পৌলোমীর মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছিল। ৩১ মে রাতে পৌলোমীর মৃত্যু হলেও তাঁদের তা জানানো হয় ১ জুন। পুলিশ প্রথমে দাবি করেছিল, এটি আত্মহত্যা। কিন্তু দীপককুমার ধর আদালতে অভিযোগ করেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট পৌলোমীর ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে।
পরিবারের তরফে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে। তাঁরা দাবি করেন, যথাযথ তদন্ত না করে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে কেস ডায়েরি তলব এবং পরিবারের সামনে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালতের ভূমিকা ও গ্রেফতার
পরিবারের আবেদন অনুযায়ী, কলকাতা হাই কোর্ট পুলিশের তদন্তে হস্তক্ষেপ করে। কোর্টের নির্দেশে নেশামুক্তি কেন্দ্রের দুটি কর্মী রিয়া চৌহান ও সাগরিকা ব্যাপারিকে গ্রেফতার করা হয়। হরিদেবপুর থানা জানিয়েছে, গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার পরেই এই গ্রেফতারি হয়েছে।
নেশামুক্তি কেন্দ্রের বক্তব্য
যে নেশামুক্তি কেন্দ্রটির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা আদালতে জানিয়েছে যে, ঘটনাস্থল সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে।
উপসংহার
পৌলোমীর রহস্যমৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ও নেশামুক্তি কেন্দ্রের কার্যকলাপ নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ সাত মাস পর অভিযুক্তদের গ্রেফতার হলেও পরিবারের অভিযোগ, পুরো বিষয়টি তদন্তে গাফিলতি করা হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ১১ ডিসেম্বর। পৌলোমীর পরিবার এবং সাধারণ মানুষ আশা করছেন, এই মামলায় সঠিক বিচার হবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবে।