বাবার বিরুদ্ধে পকসো মামলার জেরে অবসাদগ্রস্ত কিশোরী
লেক টাউন থানা এলাকায় মঙ্গলবার ঘটে গেল মর্মান্তিক এক ঘটনা। পকসো মামলায় বাবার জেলবন্দি থাকার পর থেকে মানসিক চাপ আর কটাক্ষ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে এক নবম শ্রেণির ছাত্রী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশীদের অভিযোগের মুখে ছিল মামলাকারী পরিবার, যাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন।
বাবার বিরুদ্ধে পকসো মামলা, মেয়ে কটাক্ষের শিকার
বিধাননগর কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, মৃতার বাবা পেশায় গাড়িচালক। কালীপুজোর দিন প্রতিবেশী এক নাবালিকা তাঁর বিরুদ্ধে পকসো আইনে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনেন। অভিযোগ পাওয়ার পরই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বাবা জেলে বন্দি হওয়ার পর থেকেই ওই ছাত্রীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীদের একাংশ এবং স্কুলের সহপাঠীরা তাঁকে নিয়মিত কটাক্ষ করত। রাস্তায় বেরোলেই গঞ্জনা উড়ে আসত, স্কুলে গেলেও টিটকিরি শুনতে হত।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার পর থেকে মেয়ে গভীর অবসাদে ভুগছিল। মানসিক চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মঙ্গলবার দুপুরে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে।
ঝুলন্ত অবস্থায় দেহ উদ্ধার
মৃতার মা জানান, ঘটনার দিন মেয়েটি স্বাভাবিক গলায় ফোন করে জানিয়েছিল যে সে বাড়ি ফিরে গিয়েছে। তবে বারবার ফোন করেও মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় একজন প্রতিবেশীকে মেয়ের ঘরে পাঠানো হয়। দরজা ধাক্কা দিয়েও সাড়া না পেয়ে খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মেয়েটির ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করে।
উত্তপ্ত হয়ে ওঠে লেক টাউন
এই ঘটনার পরই এলাকার বাসিন্দারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। স্থানীয়রা মৃতদেহ আটকে রেখে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁদের দাবি ছিল, নিরপরাধ বাবাকে জেল থেকে মুক্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে মামলাকারী পরিবারকে শাস্তি দেওয়ারও দাবি ওঠে।
সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মামলাকারী নাবালিকা এবং তার মাকে একাংশের মহিলারা প্রকাশ্যে মারধর করেন। এমনকি, তাদের জুতো দিয়ে মারার ঘটনাও ঘটে। উত্তেজিত জনতা অভিযোগ তোলে, সোমবার মেয়েটি জেলে গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করে ফেরার পরও তাকে “ধর্ষকের মেয়ে” বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল।
মায়ের আর্তি
মৃতার মা বলেন, “আমার স্বামী জেলে। সংসার চালাতে খুব কষ্ট করছি। এর মধ্যে আমার মেয়েটা এভাবে চলে গেল। এখন আমি কী করব?” তার এই আর্তি গোটা এলাকার মানুষের মনে বিষাদের ছাপ ফেললেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায় প্রশাসন।
পুলিশের ভূমিকা ও তদন্ত
ঘটনার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। উত্তেজিত জনতাকে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি তারা মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। তদন্তের জন্য এলাকায় সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মেয়েটির মৃত্যুর ঘটনায় মানসিক নিগ্রহই প্রধান কারণ হতে পারে। যদিও আত্মহত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা জানার জন্য পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। অভিযুক্ত বাবার মামলাও নতুন করে পর্যালোচনা করার দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা।
সমাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে সমাজের দায়িত্ববোধ নিয়ে। একজন কিশোরীর প্রতি এমন নির্মম আচরণ কেন? বাবার অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কন্যাকে কেন সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে।
উপসংহার
বাবার জেলবন্দি থাকার কারণে একটি মেয়ে যে এমন নির্মম পরিস্থিতির শিকার হবে, তা ভাবা যায় না। এই ঘটনার বিচার এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন একান্ত জরুরি। পরিবারের প্রতি সহানুভূতি এবং মেয়েটির আত্মহত্যার জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।