মহারানা প্রতাপের পরিবারে ‘গৃহযুদ্ধ’
রাজস্থানের ঐতিহ্যবাহী মেবার রাজবাড়ি এখন উত্তাল। সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে ইতিহাসখ্যাত মহারানা প্রতাপের পরিবারের সদস্যরা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। এই সংঘর্ষ এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, রাজবাড়ির সামনে পাথরবৃষ্টি পর্যন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে উদয়পুরে জারি করা হয়েছে কার্ফু। কী নিয়ে এত লড়াই? আসুন, জানি।
সম্প্রতি, মেবার রাজবাড়ির সিংহাসন পেয়েছেন মহারানা প্রতাপের বংশধর বিশ্বরাজ সিংহ। তাঁর রাজতিলক অনুষ্ঠানটি বড় আড়ম্বরপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়, এবং সেই ছবি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। রাজা হওয়ার পর, বিশ্বরাজ উদয়পুর রাজবাড়ির মন্দিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখনই তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ান কাকা অরবিন্দ সিংহ। রাজবাড়ির সম্পত্তির দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা অরবিন্দ, বিশ্বরাজকে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না।
এতদিন রাজবাড়ির তত্ত্বাবধান করছিল একটি পরিচালনা পর্ষদ, যার প্রধান ছিলেন অরবিন্দ। বিশ্বরাজের অভিযোগ, তিনি আইন ভেঙে তাঁকে রাজবাড়িতে ঢুকতে দিতে চাইছেন না। বিষয়টি আইনগতভাবে মীমাংসা করতে, উদয়পুরের স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্ফু জারি করেছে।
এই উত্তেজনার সূত্রপাত ১৯৫৫-৬৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, যখন মেবারের রাজা ছিলেন ভগবন্ত সিংহ। তিনি রাজপুত রাজ্যটি স্বাধীনতার পর পরিচালনা পর্ষদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই রাজবাড়ির সম্পত্তি সম্পর্কে নানা মতবিরোধ শুরু হয়। ভগবন্ত সিংহের দুই পুত্র—মহেন্দ্র এবং অরবিন্দ—এর মধ্যে সৃষ্টি হয় এক বড় দ্বন্দ্ব। মহেন্দ্র এর বিরোধিতা করে আদালতে মামলা করেন। এরপর থেকেই রাজপরিবারের মধ্যে এই বিরোধ চলতে থাকে।
মেবার রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ পুত্রই সিংহাসনে অধিকারী হন। কিন্তু, ভগবন্ত সিংহ মহেন্দ্রর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে অরবিন্দকে পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। এর পর মহেন্দ্র এবং তার পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, অরবিন্দ রাজবাড়ির ক্ষমতা দখল করেছেন। ২০২১ সালে, দীর্ঘদিন পর মহেন্দ্রের করা মামলার রায় দেওয়া হয়, যেখানে মেবার রাজপরিবারের সদস্যদের শম্ভু নিবাসে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হয়।
কিন্তু, বিশ্বরাজ রাজা হওয়ার পর, শম্ভু নিবাসে ঢোকার চেষ্টা করলে অরবিন্দের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করা হয়। এর ফলে সৃষ্ট উত্তেজনা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, পাথরবৃষ্টি এবং হাতাহাতি শুরু হয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজস্থান পুলিশ অবিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
এই পরিস্থিতিতে, বিজেপি বিধায়ক বিশ্বরাজ উদয়পুরের জগদীশ চকে ধর্নায় বসেন, যেখানে স্থানীয় কালেক্টর এসে তাঁকে বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে, উদয়পুরে কার্ফু জারি করা হয়।
এছাড়াও, অরবিন্দের পক্ষ থেকে তাঁর ছেলে লক্ষ্যরাজ সিংহ মাঠে নেমেছেন, যিনি দাবি করেন যে, বিশ্বরাজ এবং তাঁর সমর্থকেরা রাজপরিবারের সম্পত্তিতে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
মেবারের রাজপরিবার নিজেদের শ্রীरामের উত্তরসূরি হিসেবে পরিচিত করে থাকে, এবং সিসৌদিয়া বংশের সদস্য। মহারানা প্রতাপের বংশধরের মধ্যে চলা এই সংঘর্ষ উদয়পুর প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ায় রাজবাড়ির ভিতরে পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ করা হয়েছে।
এই উত্তেজনা এবং সম্পত্তি-বিভাগের বিরোধের সমাধান যত দিন না হয়, তত দিন উদয়পুরের এই রাজবাড়ির শান্তি ফিরে আসবে না বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।