হিন্দুকুশ পার হয়ে মধ্য এশিয়ার স্বপ্ন!
মধ্য এশিয়ার স্থলবেষ্টিত দেশ উজ়বেকিস্তান বড় স্বপ্ন দেখছে – আফগানিস্তানের কাঁকড়াঝুঁড়া পাহাড় পার করে সমুদ্র পর্যন্ত রেললাইন পৌঁছে দেওয়ার। প্রকল্পের নাম ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’, যা শেষ হবে পাকিস্তানের করাচি বা গ্বদরের মতো সমুদ্র বন্দরে। সফল হলে উজ়বেকিস্তানের বাণিজ্য বাড়বে এবং পাকিস্তানের জন্যও অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলবে।
উজ়বেকিস্তান এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর দেশটি নিজের রাজধানী তাসখন্দ নির্ধারণ করে, তবে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। সব পণ্য আমদানি-রফতানি করতে হয় মস্কো বা বেজিংয়ের মাধ্যমে। সেই সমস্যার সমাধানেই জন্ম নিল এই রেল প্রকল্পের চিন্তা।
প্রাথমিক পরিকল্পনা ২০১৮ সালে চূড়ান্ত হয়। দক্ষিণ উজ়বেকিস্তানের টার্মেজ় থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফ, কাবুল, লোগার, খারলাচি হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করবে রেললাইন। পেশোয়ার ও তোরখাম সীমান্ত অতিক্রম করে শেষ হবে করাচি, গ্বদর বা কাসিম বন্দরে।
কিন্তু প্রকল্প শুরু থেকেই নানা প্রতিবন্ধকতায় ঘেরা। কাবুল ও ইসলামাবাদ কিছু নকশা আপত্তি জানায়। ২০২৩ সালে উজ়বেক ইঞ্জিনিয়াররা নতুন নকশা তৈরি করে, তাতে পাকিস্তান-আফগান সীমান্তের তোরখাম এড়িয়ে রেলপথ দেওয়া হয়। এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।
মূল চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে হিন্দুকুশ পর্বতমালা ও আফগান ভূখণ্ডের জটিলতা। রেললাইন ৩,৫০০ মিটার উচ্চতায়, সালাং গিরিপথ দিয়ে বসাতে হবে। প্রকল্পের জন্য ১,২০০-এর বেশি কাঠামো দরকার, যার মধ্যে ৩৬০ সেতু ও দীর্ঘ সুড়ঙ্গ রয়েছে। শীতকালে সালাং এলাকায় বরফ জমে যায় এবং ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় রেললাইন স্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে ৬৪৭ কিলোমিটার রেলপথ বাস্তবায়নও কঠিন।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও বড়। আফগানিস্তান- পাকিস্তানের সম্পর্ক বর্তমানে তলানিতে, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বালোচিস্তানে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর দাপাদাপি প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাছাড়া তালিবান সরকারের বৈশ্বিক স্বীকৃতির অভাব অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি করতে পারে। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, রেললাইন কখনো তালিবানের হাতিয়ার হবে না।
অপরদিকে, রাশিয়ারও আগ্রহ থাকতে পারে, কারণ হিন্দুকুশের এই রেললাইন দিয়ে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘমেয়াদি পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালাতে রাশিয়া আইএনএসটিসি (International North-South Transport Corridor) প্রকল্পে আগ্রহী, যেখানে ভারত ও ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংক্ষেপে, ‘ট্রান্স আফগান রেলওয়ে’ প্রকল্প শুধু রেলপথ নয়, এটি মধ্য এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়। প্রযুক্তিগত, ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তাসখন্দের দৃষ্টি দৃঢ়। যদি সফল হয়, তা উজ়বেক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জন্য সমৃদ্ধির সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
শেষ লড়াইয়ের গল্প: জল থেকে তোলার পরও বেঁচে ছিলেন রাহুল, তবু বাঁচানো গেল না