হতে চাইলেন ঘরের ‘লক্ষ্মী’
নদিয়ার শান্তিপুরের এক গৃহবধূ শেফালি দে চেয়েছিলেন ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর ভাতা। কিন্তু সরকারি নথি অনুযায়ী, তিনি হয়ে গেলেন ‘বিধবা’! তাঁর স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও ‘বিধবা ভাতা’ পাচ্ছেন, এমন অভিযোগে তিনি ও তাঁর পরিবার এখন থানায় জিজ্ঞাসাবাদ, বিডিও-র হুঁশিয়ারি, এবং দালাল-চক্রের জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছেন।
শেফালির পরিবার জানিয়েছে, তাঁরা জানতেনই না যে লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে ‘বিধবা ভাতা’ মঞ্জুর হয়েছে। এদিকে পুলিশ ও বিডিও কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে। সোমবার থানায় এফআইআরও দায়ের হয়েছে।
কী ভাবে ঘটল এমন ঘটনা?
শেফালি দে-র শাশুড়ি পদ্মা দে জানান, তাঁদের মূলত লক্ষ্মীর ভান্ডারের সুবিধা পেতে সাহায্য করেছিলেন স্থানীয় এক ব্যক্তি, উত্তম দেবনাথ। পদ্মার ভাষায়, “আমরা উত্তমকে কাগজপত্র দিয়েছিলাম। সে বলেছিল, লক্ষ্মীর ভান্ডারের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু যে এটা বিধবা ভাতা, তা বুঝিনি।”
উত্তম দেবনাথ তৃণমূলের প্রাক্তন কর্মী। যদিও উত্তম নিজে জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “আমি সাধারণ মানুষের নথিপত্র সরকারি দফতরে জমা দিতাম। কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।”
তৃণমূল নেতৃত্বও উত্তমের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা অস্বীকার করেনি। স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর উৎপল সাহা জানান, উত্তমের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তাঁকে দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

পরিবার এখন কোন অবস্থায়?
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই শেফালির পরিবার এক প্রকার আতান্তরে পড়েছে। প্রথমে পুলিশ তাঁদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তারপর বিডিও সন্দীপ ঘোষ তাঁদের আধার কার্ড ও ব্যাঙ্ক নথি আটকে রাখেন।
বিডিও বলেন, “বিধবা না হয়েও বিধবা ভাতা নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। পরিবারকে টাকা ফেরত দিতে বলেছি। কিন্তু তাঁরা টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করেছেন। তাই তদন্ত চলবে এবং আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তবে পদ্মা দে জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে টাকা ফেরত দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই। তিনি বলেন, “মাসে হাজার টাকা করে পেয়েছি। তা দিয়ে সংসার চালিয়েছি। এখন এত টাকা কীভাবে ফেরত দেব?”
শাসক বনাম বিরোধী বিতর্ক
এই ঘটনার জেরে শাসক তৃণমূল ও বিরোধী বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার অভিযোগ করেছেন, “তৃণমূলের কর্মীরা সাধারণ মানুষকে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণা করছে। এক প্রকল্পের টাকার বদলে অন্য প্রকল্পের টাকা দেওয়া হচ্ছে। মানুষ বুঝতেও পারছেন না, কী প্রকল্পের অধীনে টাকা পাচ্ছেন।”
তৃণমূল যদিও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, অভিযুক্ত উত্তম দেবনাথ আর দলের সঙ্গে যুক্ত নন।
কী বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা?
শান্তিপুরের বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, লক্ষ্মীর ভান্ডার এবং অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে দালালচক্রের প্রভাব নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে দারিদ্রসীমার নীচে থাকা মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে নথিপত্র সংগ্রহ করে এমন জালিয়াতি হয়।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
শেফালির পরিবার এখন দরজায় দরজায় ঘুরছে। শাশুড়ি পদ্মা দে ব্যাঙ্ক, পুরসভা, পঞ্চায়েত অফিস থেকে বিডিও অফিস—সব জায়গায় গিয়েছেন। কিন্তু এখনও সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিডিও জানিয়ে দিয়েছেন, টাকা ফেরত না দিলে গ্রেফতারির আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, পরিবার বলছে, তাঁরা কোনও জালিয়াতি সম্পর্কে জানতেন না এবং টাকা ফেরত দেওয়ার মতো সামর্থ্যও নেই।
উপসংহার
এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি পরিবারের সমস্যার উদাহরণ নয়। এটি সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দালাল-চক্র এবং প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়টি সামনে আনে। গরিব মানুষের অধিকার সুরক্ষিত করতে প্রশাসনের আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
কর্নাটকের পরে গুজরাতে এইচএমপিভির হানা! শিশুদের যত্নে বিশেষ পরামর্শ চিকিৎসকদের