স্বাধীনতা কার?
ভারত ৭৮ বছর আগে স্বাধীনতা পেয়েছিল। সেই সময় এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন ভারত যেন একটি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ, ন্যায়নিষ্ঠ রাষ্ট্র হয়ে ওঠে। সংবিধান লেখা হয়েছিল সমানাধিকারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সেই স্বপ্নের কতটা প্রতিফলন ঘটাচ্ছে? অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মতে, বাস্তবে আমরা সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছি। স্বাধীনতার প্রয়োগ এবং বণ্টনের পদ্ধতিতেই যেন কোথাও বড়সড় ত্রুটি রয়ে গেছে।
আজকের শাসকরা যেন স্বাধীনতার একমাত্র ‘এজেন্সি’। রাষ্ট্রব্যবস্থা ঠিক করে দেয়, কে কতখানি স্বাধীনতা ভোগ করবে। যার হাতে বেশি অর্থ, প্রভাব বা ক্ষমতা, তার স্বাধীনতাও যেন ততটাই বিস্তৃত। ইংরেজিতে এই ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে বলা হয় ‘অলিগার্কি’ বা গোষ্ঠীপতিত্ব। সহজ কথায়, স্বাধীনতা এক টুকরো কেকের মতো, যেটির ভাগাভাগি নিয়ন্ত্রণ করছে একদল প্রভাবশালী মানুষ। সংবিধান সবার জন্য সমানাধিকারের কথা বললেও, বাস্তবে সেই সমতা কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
অনির্বাণের কথায়, এই বৈষম্য বোঝার জন্য দূরদৃষ্টির দরকার নেই। তিনি নিজের উদাহরণ টেনে বলেন, তাঁর মতো প্রভাবশালী বা জনপ্রিয় মানুষের কাছে যে স্বাধীনতার সুযোগ পৌঁছে গেছে, তা হয়তো দেশের অনেক সাধারণ মানুষ কখনওই পান না। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন মুর্শিদাবাদের বাসুদেবপুর গ্রামের সুজন সরকারের কথা। জীবিকার সন্ধানে সুজন এখন নাগপুরে দিনমজুরি করছেন। ভারতীয় সংবিধান যে সমানাধিকার তাঁকে দিয়েছে, সেই অধিকার অনির্বাণেরও আছে। কিন্তু যেভাবে রাষ্ট্র স্বাধীনতার সুযোগ বিলি করছে, তাতে একজন শিল্পীর কাছে যে পরিমাণ সুযোগ এসে পৌঁছেছে, সুজনের মতো মানুষদের কাছে তার সামান্য অংশও পৌঁছায়নি।
অনির্বাণের বক্তব্য এক গভীর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—স্বাধীনতা হয়তো আইনের দৃষ্টিতে সবার জন্য সমান, কিন্তু বাস্তবে তা এক বিরাট বৈষম্যের শিকার। সমাজ, অর্থনীতি এবং রাজনীতির স্তরে যে অদৃশ্য প্রাচীর তৈরি হয়েছে, তা স্বাধীনতার স্বপ্নকে আজও সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।
স্বাধীনতার আসল অর্থ হয়তো কেবল শাসক শ্রেণি বা প্রভাবশালীদের হাতে আটকে নেই, বরং সাধারণ মানুষের কাছে সেই স্বাধীনতাকে পৌঁছে দেওয়ার সঠিক প্রয়াসের অভাবেই এই ফারাক তৈরি হয়েছে। অনির্বাণ এই প্রসঙ্গ তুলে ধরে আমাদের মনে করিয়ে দেন—স্বাধীনতা মানে কেবল আইনগত অধিকার নয়, বরং প্রতিটি মানুষের জন্য মর্যাদা, সমান সুযোগ এবং নিরাপত্তার বাস্তব নিশ্চয়তা।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—স্বাধীনতা কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, নাকি তা কেবল কিছু বিশেষ মানুষের জন্যই এক বিলাসবহুল সুযোগ?