শিলিগুড়ির ফাড়াবাড়ি মোড়ের বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলজুড়ে এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিকিম থেকে আনানো হচ্ছে গৃহস্থালির বর্জ্য, যা ফেলা হচ্ছে এই বনাঞ্চলের এক প্রান্তে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে গ্রামবাসী, শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না, আর বন্যপ্রাণীদের জীবনে নেমে এসেছে চরম সংকট।
জঞ্জালের উৎস খুঁজে বার করা
বৈকুণ্ঠপুর জঙ্গলের পাশেই রয়েছে একটি ফাঁকা জমি। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সেখানে নিয়মিতভাবে বর্জ্য ফেলার কাজ চলছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আবর্জনা সিকিমের লোয়ার মারতাম ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে আনা। একাধিক গাড়ি ত্রিপলে মোড়া আবর্জনা নিয়ে এসে জমি ফেলে দিয়ে চলে যেত। দুর্গন্ধ ছড়ানোর পর গ্রামবাসীরা টের পান ঘটনাটি।
সোমবার সকালে বর্জ্য বোঝাই চারটি ট্রাক আটকে দেন স্থানীয়রা। পরে পুলিশ এসে গাড়িগুলি আটক করে। গাড়ির চালকরা স্বীকার করেন যে, এই আবর্জনা সিকিম থেকে আনা হয়েছে এবং সেগুলো বিহারের সিমেন্ট কারখানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ ছিল। তবে মাঝপথে কেন এগুলো শিলিগুড়িতে ফেলা হলো, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
সিকিম সরকারের ব্যাখ্যা
সিকিম সরকারের নগরোন্নয়ন দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি জিতেন্দ্র রাজি জানিয়েছেন, এই সমস্যাটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত একটি বেসরকারি সংস্থার গাফিলতির ফল। সংস্থাটি প্রথম ধাপে সিকিমেই বর্জ্য পরিশোধন করে এবং পরে সেগুলো বিহারে প্রেরণ করে। তবে এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সিকিমে যেখানে রাস্তায় আবর্জনা ফেললে জরিমানা করা হয়, সেখানে তারা কীভাবে নিজেদের বর্জ্য বাংলায় ফেলে যাচ্ছে? বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এই ডাম্পিংয়ের ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীদেরও বিপদে ফেলেছে। আবর্জনার গন্ধে শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। হাতির করিডোরের নিকটবর্তী হওয়ায় এ নিয়ে বন্যপ্রাণ সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জমির মালিকের ভূমিকা
যে জমিতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছিল, তার মালিক দীপক পাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কাউকে কোনও অনুমতি দেননি। বনবিভাগ বা রাজ্য সরকারের কোনও নোটিশও পাননি। তিনি জানিয়েছেন, জমি পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করবেন। তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, মুনাফার লোভেই জমি বর্জ্য ফেলার কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশপ্রেমীদের প্রতিবাদ
পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলো সরব হয়েছে। স্ন্যাপ-এর কর্ণধার কৌস্তভ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, সিকিম যেখানে নিজেকে সবুজ রাজ্য হিসেবে দাবি করে, সেখানে এই ধরনের আচরণ অগ্রহণযোগ্য। শিলিগুড়ি গ্রিন এনভায়রনমেন্ট প্রিজ়ার্ভেশন সোসাইটির সম্পাদক দেবব্রত চক্রবর্তীও জানিয়েছেন, এই ধরনের ডাম্পিং জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ উভয়ের জন্য বিপজ্জনক।
বন বিভাগের পদক্ষেপ
বন বিভাগ জানিয়েছে, জমিটি তাদের সীমানার বাইরে হলেও এটি হাতির করিডোরের নিকটবর্তী। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ ঠেকানোর জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার ফলে সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ ও প্রশাসনিক তৎপরতার মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জনসাধারণের স্বার্থে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।