কাটোয়ার গীধেশ্বর মন্দিরে দাসেরা পেলেন পুজোর অধিকার!
পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার গীধগ্রামের গীধেশ্বর মন্দিরে দীর্ঘ সাড়ে তিনশো বছর ধরে চলে আসা একপ্রকার সামাজিক বঞ্চনার অবসান ঘটল। এতদিন দাস সম্প্রদায়ের মানুষেরা সেখানে পুজো দিতে পারতেন না। কিন্তু প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এবার সেই রীতি বদলেছে। এখন থেকে সকলেই সমানভাবে মন্দিরে প্রবেশ করে পূজা দিতে পারবেন।
দীর্ঘ বৈষম্যের অবসান
এই ঘটনার সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি, শিবরাত্রির দিন। গীধগ্রামের দাস সম্প্রদায়ের ১৩০টি পরিবারের সদস্যরা মন্দিরে মহাদেবের পুজো দিতে চাইলে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর গ্রামে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক দফায় বিতর্ক ও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মন্দির চত্বরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।
গ্রামের একাংশের দাবি ছিল, এটি তাঁদের পূর্বপুরুষদের তৈরি রীতি। তাই দাস সম্প্রদায়ের মানুষরা মন্দিরে পুজো দিতে পারবেন না। অন্যদিকে, দাস সম্প্রদায়ের মানুষরা এই বৈষম্যের অবসান চাইছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, একই গ্রামের বাসিন্দা হয়েও কেন তাঁরা এতদিন মন্দিরে প্রবেশ করতে পারলেন না?
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
বিতর্ক চরমে পৌঁছালে প্রশাসন দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। মঙ্গলবার কাটোয়ার মহকুমাশাসক অহিংসা জৈনের নেতৃত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কাটোয়ার বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, মঙ্গলকোটের বিধায়ক অপূর্ব চৌধুরী, ব্লক প্রশাসনের আধিকারিক, পুলিশ এবং মন্দির কমিটির সদস্যরা।
দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, গীধেশ্বর মন্দিরে দাস সম্প্রদায়ের মানুষসহ সকলেই সমান অধিকার নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন এবং পুজো দিতে পারবেন। কাটোয়ার মহকুমাশাসক বৈঠকের পর জানান, “গীধগ্রামে মন্দিরে পুজো দেওয়া নিয়ে যে সমস্যা ছিল, তা মিটে গিয়েছে। আগামী বুধবার থেকে সকলেই সমানভাবে পুজো দিতে পারবেন। এই সিদ্ধান্ত সকল পক্ষ মেনে নিয়েছে।”
সাড়ে তিনশো বছরের প্রথার পরিবর্তন
গীধেশ্বর মন্দিরের পুজোর প্রচলন হয় প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে, জমিদারদের উদ্যোগে। সেই সময় থেকে দাস সম্প্রদায়ের মানুষদের মন্দিরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। শিবরাত্রির দিন এই নিয়ম ভাঙতে গেলে সংঘর্ষ তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকার কারণে ঐতিহাসিক এই পরিবর্তন সম্ভব হল।
মন্দির কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
মন্দিরের সেবায়েত বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে বলেন, “আমাদের মন্দিরে সাধারণত ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা পুজো করেন। কেউ চাইলে নৈবেদ্য এনে মন্দিরে রাখতে পারেন, কিন্তু পুজোর মূল দায়িত্ব ব্রাহ্মণদেরই থাকে।”
তবে এই বক্তব্য দাস সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাঁদের বক্তব্য ছিল, মন্দির তো সকলের জন্য, তাহলে তাঁরা কেন এতদিন বাইরে ছিলেন?
এক নতুন যুগের সূচনা
অবশেষে দীর্ঘ বিতর্কের পর সমাধান এল। কাটোয়ার গীধগ্রামে আর কোনো সামাজিক বিভাজন থাকবে না। সকলেই সমানভাবে গীধেশ্বর মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবেন এবং পুজো দিতে পারবেন।
এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত কেবল কাটোয়ার নয়, সমগ্র বাংলার সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
ভারতের বদলার জয়: ২৫ বছর পর নিউ জিল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি রোহিতদের হাতে