এই বিষবাষ্প
আজকের বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার যতই এটি অস্বীকার করুক, বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলে ইন্দিরা গান্ধী এবং তাঁর সরকারের অবদান কেউই কোনো দিন অস্বীকার করতে পারবে না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা—এই সব কিছু ইতিহাসের অমোঘ অংশ। ‘সংখ্যালঘু শান্তি পাক’ প্রবন্ধের লেখক সুবোধ সরকার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, কিন্তু এটি কেবল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির একটি অঙ্গীকার নয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক সম্পর্কের জটিলতা, যেখানে উভয় দেশই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ও একসাথে জড়িয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশে যে বর্তমান পরিস্থিতি চলছে, তা শুধু সংখ্যালঘু বা হিন্দু-মুসলিম সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অনেক বড় কিছু, যা অন্তর্নিহিত এক প্রাচীন প্রতিশোধস্পৃহা ও ইতিহাসের পালা বদলের ছায়ায় তৈরি হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পর থেকেই এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল, এবং সেই ক্ষত আজও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয় ভারতীয় সহযোগিতায়, এবং ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত যে সমর্থন দিয়েছিল, তাও মুছে ফেলা সম্ভব নয়। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এই দুই দেশই এক ধরনের ঈর্ষা এবং ক্ষোভের অংশী হয়ে উঠেছে, যা আজকের দিন পর্যন্ত প্রকট রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে কখনও এই কথা শোনা যাবে না, তবে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যে ভারতীয় সহায়তায় দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তা সবাই জানে। প্রতিবেশী দেশগুলি নানা কারণে ভারতের ওপর নির্ভরশীল, এবং ভারত ছাড়া তাদের পথ চলা সম্ভব নয়। চিন যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তেমনি ভারত কখনও তাদের মতো অগ্রহণযোগ্য দাদাগিরি দেখায়নি। বাংলাদেশের মন্দির ভাঙা, দেবতার মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, এবং অন্যান্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা যেগুলি ঘটেছে, সেগুলির বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি—এটি ভারতীয় সহনশীলতার এক নিদর্শন। তবে, আজকালকার পরিস্থিতিতে এই সহনশীলতা এক ধরনের অসহায়ত্বে পরিণত হয়েছে, যেটি আমাদের চিন্তার জন্য খোলামেলা প্রশ্ন রাখে।
এখন যদি ‘সংখ্যালঘু শান্তি পাক’ প্রবন্ধটির দিকে ফিরে তাকানো হয়, তবে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিত্তিতে। এমনকি, মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মের পরিচয় কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা পাক সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্য, এবং সেই সময়ের সকল বাঙালি—হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে—একসাথে “আমার ভাষা তোমার ভাষা বাংলা ভাষা” শ্লোগান দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ, কেন বাংলাভাষী নাগরিকদের একটি অংশকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি গভীরতা ধারণ করে। আজকাল ধর্মীয় পরিচয়ই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভাষার পরিচয় দ্বিতীয় হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান শাসক শ্রেণির কাছে যে প্রশ্নটি ওঠে, তা হল—শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশ কি একাত্তরের সেই সময়ে ফিরে যেতে চাইছে, যখন ধর্মীয় বিভাজন ছিল প্রধান? যদি তাই হয়, তবে একুশে ফেব্রুয়ারি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কি সবকিছু ভোলাতে চলেছে? তবে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আজকের দিনেও, বাংলাদেশে কোনও ধর্মীয় সংখ্যালঘু শান্তিতে নেই, এবং তা পুরো পৃথিবীর সামনে এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
‘নেহরু মডেল’-এর সমালোচনা এবং ভারতের সমাজতান্ত্রিক নীতি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে, ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যে যে অস্পষ্টতা ছিল, তার প্রভাব আজও বিস্তৃত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু তার যুগান্তকারী উদ্যোগ এবং সমাজতন্ত্রের ধারণা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তবে সেগুলির মধ্যে কোনও একীভূততা ছিল না। তবে, বর্তমান সময়ে, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং বিভাজনের প্রয়াসের মধ্যে ভারতকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এসব বিষয়গুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, ভারতীয় সমাজের চিত্র এবং ইতিহাসের গুণগত পরিবর্তন—সবই এমন এক বিষবাষ্পে পরিণত হয়েছে, যা আজও আমাদের সামনে রহস্যের আবরণ ফেলেছে।
ইডেনে খেলেননি শামি, চেন্নাইয়ে কি খেলবেন? সতীর্থ আরশদীপের মন্তব্যে ধোঁয়াশা