শ্রীজাতের প্রথম প্রেম
শ্রীজাতের জীবনটা যেন এক অদ্ভুত মেলবন্ধন—কখনো একদম অলস, কখনো বা নির্ভীক পরিশ্রমী। কবিতা ওর প্রথম প্রেম, আর আমি, দূর্বা, তার জীবনের অন্য এক অভিন্ন অংশ। এমনকি আমরা, শ্রীজাত আর আমি, একে অপরের সাথে পাশাপাশি থাকলেও যেন দু’টি আলাদা জগতের বাসিন্দা। কখনো তা মেজবৌ-সেজবৌর মতো, কখনো তা কবি এবং তার সঙ্গিনী।
শ্রীজাতের মধ্যে এমন এক অদ্ভুত চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অনেকেই বোঝে না। সে যখন একলা থাকে, তখন পুরোপুরি অলস হয়ে পড়ে—সুযোগ পেলেই গান শোনে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেয়। তবে এর মধ্যে একটাও দোষ নেই, কারণ তাকে যখন দরকার পড়ে, তখন সে ঠিক সময়ে উঠে যায়, কাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা গভীর। মনে পড়ে, ‘পুষ্পা ২’ ছবির কাজ করার সময় শ্রীজাত কীভাবে কলকাতা থেকে চেন্নাই গিয়েছিল, কত রাত পর্যন্ত কাজ করেছে। সে সত্যিই পরিশ্রমী, কাজের প্রতি তার যে নিষ্ঠা, তা অনেকের কাছেই অদ্ভুত মনে হতে পারে। ছবিটির মুক্তি না হওয়ার পরও তার মধ্যে কোনও দুঃখবোধ ছিল না, বরং সে তার চারপাশে অদ্ভুতভাবে নিরাসক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাতে আমি অবাক হইনি, কারণ এটা তার ব্যক্তিত্বেরই অংশ।
তবে শ্রীজাতের জীবনটা শুধু কাজ বা কবিতা দিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। তার মধ্যে রয়েছে এক বিশেষ সম্পর্ক—আমাদের সম্পর্ক। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব, বোঝাপড়া, আর আদান-প্রদানই সবকিছু। শ্রীজাতের কবিতায় প্রেম থাকে, কিন্তু তার বাস্তব জীবনে প্রেমের প্রকাশ অনেকটাই কম। অনেকেই ভাবেন, একজন কবি তার স্ত্রীকে নিয়ে কবিতা লিখে, কিন্তু শ্রীজাত তেমন কিছু করে না। সে অবশ্য আমায় একাধিকবার তার কবিতায় উল্লেখ করেছে, তবে সেগুলি প্রকাশ্যে আনতে সে এখনও রাজি নয়। আমি তার প্রতি খুবই সচেতন, বিষয়টি নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই না, কারণ আমি জানি, মানুষ তার অনুভূতিতে বহুগামী। একই সঙ্গে, আমি জানি, সে আমার প্রতি তার ভালোবাসা গভীর এবং আমি তার প্রতি তেমনই অনুভব করি।
শ্রীজাত এমন একজন মানুষ, যে ঝগড়া করতে পারে না। আমি যখন রেগে গিয়ে চেঁচিয়ে মরি, সে তখন একদম নিশ্চুপ থাকে। আমি নিজেই থেমে যাই, আর সে কোনোভাবেই তাতে হেলদোল দেয় না। এটা আমাদের জীবনের এক বিশেষ দিক—একদম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তবে এক দিক দিয়ে শ্রীজাত খুবই দায়িত্ববান। পরিবারে কেউ অসুস্থ হলে সে সবার আগে পাশে থাকে। কোনও অতিথি এলে সে নিজেই তাকে আপ্যায়নের দায়িত্ব নিয়ে নেয়। তবে শপিং করতে গেলে সে কখনোই বাজার করতে যাবে না! বিদেশ থেকে ফিরে আমার জন্য টুকটাক উপহার নিয়ে আসে—তার ছোটোখাটো এই দুঃসাহসিকতা ওর অন্তরের স্নেহের প্রকাশ।
একটা দারুণ দিক হলো, বয়সের সাথে শ্রীজাতের লেখার কলম আরও পরিণত হয়ে উঠেছে। যেমনটা তাকে দেখেছি, তেমনটা হয়ত সবাই না দেখতে পায়—কিন্তু একজন কবির জীবনের এই নীরব সংগ্রাম, যেভাবে সে নিজের ভেতরকার দ্বন্দ্বগুলো নিয়ে সামলাতে শিখেছে, তাতে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে গেছে। আর সত্যি কথা বলতে, আমি আর শ্রীজাত একে অপরকে সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝি, কখনো কখনো শব্দের চেয়েও গভীরতর আমাদের এই সম্পর্কের ভিত্তি।