চিনের উত্থানে কি তেলের বাজারে চাপ পড়বে ওপেকের!
বিরল ধাতু, চিপস বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— একের পর এক ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছে চিন। এ বার সেই তালিকায় যোগ হল অপরিশোধিত তেল। বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্যে পাথরের গভীর থেকে শেল তেল তুলে আন্তর্জাতিক শক্তি মানচিত্রে নতুন করে মাথা তুলছে বেজিং। প্রশ্ন উঠছে, এই সাফল্য কি আগামী দিনে তেলের বাজারে দীর্ঘদিনের দাপুটে খেলোয়াড় OPEC-এর জন্য অশনি সঙ্কেত হয়ে দাঁড়াবে?
শেল তেল আসলে কী
শেল তেল বা ‘টাইট অয়েল’ সাধারণ অপরিশোধিত তেলের মতো নয়। এটি শেল শিলার মধ্যে আটকে থাকা হাইড্রোকার্বন, যাকে তুলতে হয় অত্যাধুনিক ‘ফ্র্যাকিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এত দিন এই ক্ষেত্রে মূল নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসেব অনুযায়ী, চিনের মাটির নিচে থাকা শেল তেলের ভান্ডার এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম।
শিনজ়িয়ান থেকে ‘শেল বিপ্লব’
২০২০ সালে চিনের শিনজ়িয়ান প্রদেশে জিমসার তৈলক্ষেত্রে বিশাল শেল তেলের ভান্ডারের সন্ধান মেলে। তার পর ধাপে ধাপে শুরু হয় বাণিজ্যিক উত্তোলন। চলতি বছরের ডিসেম্বরেই ওই খনি থেকে বছরে ১৭ লক্ষ টন তেল তোলার লক্ষ্য ছুঁয়েছে বেজিং। সরকারি হিসেব বলছে, জিমসার এলাকা থেকেই ভবিষ্যতে প্রায় ১০০ কোটি টন অপরিশোধিত তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা China National Petroleum Corporation-এর এক কর্তা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে প্রতিটি কূপ থেকেই আগের তুলনায় অনেক বেশি তেল তোলা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই এই ঘটনাকে ‘চিনের শেল বিপ্লব’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর কৌশল
বর্তমানে অপরিশোধিত তেল আমদানির নিরিখে চিন বিশ্বের শীর্ষে। রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরাক-সহ একাধিক দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনতে হয় বেজিংকে। শুধু ২০২৪ সালেই ওপেকের মোট বিক্রি হওয়া তেলের প্রায় ২৭ শতাংশ কিনেছিল চিন। ফলে নিজের দেশে শেল তেল উৎপাদন বাড়ানো মানে আমদানির উপর নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আরও মজবুত করা।
এখনও অবশ্য চিন শেল তেল রফতানি করছে না। কিন্তু উৎপাদন যদি এই হারে বাড়তে থাকে, তা হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন বিক্রেতা হিসেবে বেজিংয়ের আবির্ভাব উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
ওপেকের অস্বস্তি কোথায়
তেলের দামে নিয়ন্ত্রণ রাখতে ওপেক দীর্ঘদিন ধরেই উৎপাদনে লাগাম টেনে চলে। যদি চিন ভবিষ্যতে নিজস্ব শেল তেল বাজারে ছাড়ে, তা হলে সরবরাহ বাড়বে। সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনাও প্রবল— যা ওপেকভুক্ত বহু দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
ইতিমধ্যেই ওপেকের অন্দরে মতভেদ স্পষ্ট। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সংগঠন ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে তেল উৎপাদন নিয়ে টানাপড়েনও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে চিনের উত্থান চাপ আরও বাড়াতে পারে।
তবে সবটাই কি এত সহজ?
সব বিশ্লেষক কিন্তু অতটা আশাবাদী নন। গবেষণায় উঠে এসেছে, চিনের শেল তেল ভান্ডার তুলনামূলক ভাবে অনেক গভীরে এবং শিলাগুলি বেশ শক্ত। ফলে আমেরিকার মতো দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো সহজ নয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শেল তেলের হাত ধরে চিন যে নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলেছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এই যাত্রা কতটা দূর যাবে, আর তাতে ওপেকের ব্যবসা সত্যিই কতটা চাপে পড়বে— তার উত্তর দেবে সময়ই। তবে ‘ড্রাগন’ যে এবার তেলের খেলায় নেমেছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।