শিল্পমঞ্চে জিএসটি-র হিসেব চাইতে গিয়ে কেন্দ্র ও অমিত মিত্র
বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যের শেষ বাণিজ্য সম্মেলনেই রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতায় আয়োজিত এক দিনের ‘বিজ়নেস কনক্লেভ’-এর মঞ্চ থেকে তিনি ফের জিএসটি নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিলেন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিরল এক মুহূর্তে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করলেন নিজের দীর্ঘদিনের মুখ্য পরামর্শদাতা ও প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকেও।
ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত ওই সম্মেলনে দেশ-বিদেশের শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সামনে মমতার বক্তব্য ছিল যথেষ্ট তীক্ষ্ণ। তাঁর অভিযোগ, জিএসটি চালুর ফলে রাজ্যের আর্থিক স্বার্থ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, “জিএসটির নামে আমার রাজ্য থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা কেটে নিয়ে গিয়েছে কেন্দ্র। এখন রাজ্যের হাতে আর নিজস্ব করই নেই।”
জিএসটি চালুর সময় যে সিদ্ধান্তকে একদা সমর্থন করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, “তখন বলা হয়েছিল অভিন্ন করকাঠামো এলে রাজ্যগুলোর লাভ হবে। এই অমিত মিত্রই আমাকে বুঝিয়েছিলেন। আজ ওঁকেই বলতে হবে— জিএসটির পরেও কেন টাকা কাটা হচ্ছে?” মঞ্চে বসে থাকা অমিত মিত্রের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ থেমেও যান মুখ্যমন্ত্রী, যেন উত্তরের অপেক্ষায়।
অমিত মিত্র জবাবে জানান, সংসদে কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করেছে যে জিএসটি ব্যবস্থায় প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার প্রতারণা হয়েছে। তাতেই আরও চড়ে বসেন মমতা। তাঁর পাল্টা মন্তব্য, “আপনি বলছেন ২ লক্ষ কোটি। আসলে কত লক্ষ কোটি হয়েছে, কে জানে! আপনি পরিষ্কার করে বলুন— জিএসটি রাজ্যের জন্য লাভজনক, না ক্ষতিকর?”
এই প্রকাশ্য মতবিরোধ রাজনীতির মঞ্চে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই। কারণ, মাসখানেক আগেই মমতা প্রথম বার স্বীকার করেছিলেন যে জিএসটি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা তাঁর বড় ভুল ছিল। সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর ভরসা করেই পশ্চিমবঙ্গ প্রথম দিকেই জিএসটি মেনে নিয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এত বছর পরে এসে তাঁর দাবি, সেই আস্থা আদতে ভেঙেছে।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে আইজিএসটি বা ইন্টিগ্রেটেড জিএসটি। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য বা পরিষেবা বিক্রির ক্ষেত্রে যে কর আদায় হয়, তার পুরো টাকা প্রথমে কেন্দ্রের ঘরেই যায়। পরে রাজ্যগুলির ভাগ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও সেই টাকা নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না বলেই মমতার অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, “রাজ্যের পাওনা আটকে রেখে কেন্দ্র উল্টে আমাদের কাছ থেকেই টাকা তুলে নিচ্ছে।”
শিল্প সম্মেলনের মঞ্চে এই বক্তব্য যে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট। শিল্পপতিদের সামনে দাঁড়িয়েই মমতা বুঝিয়ে দিলেন— জিএসটি ইস্যুতে তিনি আর চুপ থাকবেন না। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ যেমন তুলে ধরলেন, তেমনই নিজের দলের ভিতরের পুরনো সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলতে পিছপা হলেন না।
সব মিলিয়ে, জিএসটি নিয়ে মমতার এই আক্রমণ শুধু কেন্দ্রকেই নয়, রাজ্যের রাজনীতিতেও নতুন করে বিতর্কের আগুন জ্বালাল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।