শব্দবাজির প্রতিবাদে হামলার শিকার এন্টালির তরুণ
কলকাতার এন্টালিতে শব্দবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হলেন এক তরুণ। রবিবার রাতে এন্টালি থানার অধীন আনন্দ পালিত রোডের ‘উত্তরণ’ বসতি এলাকায় এই ঘটনার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ অনুসারে, বাড়ির সামনে ক্রমাগত শব্দবাজি ফাটানো হচ্ছিল, যা তরুণটির হৃদরোগী মায়ের স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠেছিল। তবে প্রতিবাদ করতে যাওয়াতেই সায়ন কুন্ডু নামে ওই তরুণের ওপর হামলা চালায় স্থানীয় দুষ্কৃতীরা। প্রায় ১৫-২০ জন লোক মিলে তাঁকে মারধর করে এবং ইটের আঘাতে সায়নের মাথায় ফাটল দেখা দেয়। ইতিমধ্যে পুলিশ দুজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে, তবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকা জুড়ে।
শব্দবাজির প্রতিবাদ ও হামলার শুরু
এন্টালির সরু গলির মাঝে, যেখানে প্রতি ঘরেই প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষ রয়েছেন, সেখানেই সায়ন তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন। তাঁর মা খুকুমণি কুন্ডু দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছেন, আর তাই শব্দবাজির তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো জরুরি হয়ে পড়ে পরিবারের জন্য। অভিযোগ করা হয়, রবিবার রাতে সায়নের বাড়ির সামনে শব্দবাজির তাণ্ডব শুরু হলে তাঁর বাবা সুশীল কুন্ডু প্রথমে প্রতিবাদ করেন। সুশীল বাবু ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রশ্ন করেন, কেন তাঁদের বাড়ির সামনেই শব্দবাজি ফাটানো হচ্ছে যখন আরও অনেক ফাঁকা জায়গা রয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদ শোনার পরিবর্তে দুষ্কৃতীরা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং বাজি ফাটানো চালিয়ে যায়।
মারধরের শিকার তরুণ
প্রথমে সুশীল বাবু কথা বললেও যখন প্রতিবাদে কোনো কাজ হয়নি, তখন সায়ন নিজেই পরিস্থিতি সামলাতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁর প্রতিবাদকে পাত্তা না দিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হয়ে সায়নের ওপর আক্রমণ চালায়। তাঁর অভিযোগ, প্রায় ১৫-২০ জন ব্যক্তি মিলে তাঁকে ঘিরে ধরে মারধর করতে থাকে এবং ইট দিয়ে সায়নের মাথায় আঘাত করে। ইটের প্রচণ্ড আঘাতে সায়নের মাথা ফেটে যায় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। সায়নের বাবা-মা এই ঘটনায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই ঘটনার পরপরই কুন্ডু পরিবার এন্টালি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন, এবং এর ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
এলাকার আতঙ্ক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
শুধু এন্টালিতেই নয়, কলকাতার আজাদগড় এলাকাতেও একই রকম একটি ঘটনা ঘটে। সঞ্জয় ভট্টাচার্য নামে আরেকজন প্রতিবাদীও একইভাবে হামলার শিকার হন। তাঁর বাড়িতেও গুরুতর অসুস্থ কাকা রয়েছেন, যাঁর জন্য শব্দবাজি প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। রাত ১০টার দিকে সঞ্জয় বাবু প্রতিবাদ করতেই দুষ্কৃতীরা তাঁকেও মারধর করে। সঞ্জয় বাবু এরপর কলকাতা পুলিশের ডিসি (সাউথ)-এর কাছে ইমেলের মাধ্যমে ঘটনার বিবরণ জানান। এই ঘটনার পরে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়। এন্টালির ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যে পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করেছে এবং বাকিদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
শব্দবাজি বন্ধে নাগরিক সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা
শব্দবাজি নিয়ন্ত্রণে আইন থাকা সত্ত্বেও শহরের অনেক জায়গায় প্রতিনিয়ত এর নিয়ম ভঙ্গ করা হচ্ছে, যা শুধু অসুস্থ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনকই নয়, বরং প্রতিবাদীদের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে। কালীপুজো ও দীপাবলির সময় শব্দবাজির কারণে অসংখ্য প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষকে চরম কষ্ট সহ্য করতে হয়। প্রশাসনিক নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের সমস্যা নির্মূল হচ্ছে না। বিশেষ করে ছোট, সরু গলির বাসিন্দারা, যেখানে ঘরগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পাশাপাশি, তাঁদের পক্ষে শব্দবাজি এক মারাত্মক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।
কলকাতা পুরসভার আওতায় থাকা এই ধরনের এলাকায় পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় নাগরিকদেরও সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। নিজেদের আনন্দের জন্য অন্যের ক্ষতি করে না এমন একটি সামাজিক সচেতনতার বিকাশ হওয়া উচিত। প্রতিবেশীদের সুস্থতা ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে উৎসব পালন করা উচিত।
শব্দবাজি প্রতিরোধে প্রশাসনের ভূমিকা
প্রশাসন এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিলেও এটি যে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট। দুষ্কৃতীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশি তৎপরতা প্রয়োজন। কেবল অভিযোগ গ্রহণ করলেই নয়, বরং নিয়মিত টহল ও যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করলে এ ধরনের ঘটনা কমতে পারে। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন করারও প্রয়োজন আছে।
এ ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির জন্যই নয়, বরং সমাজের শান্তি নষ্ট করার জন্য দায়ী। নাগরিকরা যদি নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হন, এবং প্রশাসন যদি যথাযথ পদক্ষেপ নেয়, তাহলে শব্দবাজির এই তাণ্ডব কমিয়ে আনা সম্ভব।