লাল গ্রহের সাদা রহস্য!
মঙ্গল মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক শুষ্ক, লাল, প্রাণহীন গ্রহের ছবি। চারদিকে ধুলো, পাথর আর নির্জনতা। কিন্তু সেই পরিচিত ছবির মাঝেই হঠাৎ ধরা পড়েছে এক অচেনা দৃশ্য—মঙ্গলের মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সাদা পাথর। এমন পাথর আগে কখনও দেখা যায়নি লাল গ্রহে। নাসার ‘প্রিজ়ারভেন্স’ রোভার এই পাথরের ছবি পাঠানোর পর থেকেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহল তুঙ্গে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই সাদা পাথরই হয়তো মঙ্গলের একেবারে অন্য রকম অতীতের সাক্ষী।
মঙ্গলে জল ছিল—এই ধারণা নতুন নয়। নদী, হ্রদ, এমনকি প্রাচীন সমুদ্রের চিহ্নও আগে মিলেছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই নিশ্চিত, প্রাণ থাকুক বা না থাকুক, একসময় মঙ্গলে জল ছিল প্রচুর। কিন্তু সেই জল কি শুধু জমে থাকা হ্রদ আর নদীতেই সীমাবদ্ধ ছিল? নাকি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত, ঠিক পৃথিবীর মতো? নতুন আবিষ্কার সেই প্রশ্নেই নতুন আলো ফেলেছে।
আমেরিকার পুরডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান ব্রোজ় ও তাঁর গবেষক দল নাসার পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, মঙ্গলে পাওয়া ওই সাদা পাথর আসলে ‘কেওলিনাইট’ নামের এক ধরনের কাদামাটির শিলা। এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘কমিউনিকেশন্স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে। কেওলিনাইট পৃথিবীতেও পাওয়া যায়, বিশেষ করে উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে। দীর্ঘ সময় ধরে জল পাথর ও পলির উপর দিয়ে বয়ে গেলে অধিকাংশ খনিজ ধুয়ে যায়, তখনই তৈরি হয় এই সাদা শিলা।
বিজ্ঞানীদের মতে, কেওলিনাইট তৈরি হওয়ার জন্য দরকার লক্ষ লক্ষ বছর ধরে উষ্ণ, স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া এবং নিয়মিত বৃষ্টি। পৃথিবীর রেইনফরেস্ট অঞ্চলগুলিতে এই ধরনের পাথর প্রচুর দেখা যায়। কিন্তু এতদিন মঙ্গল সম্পর্কে যে ধারণা ছিল, তাতে এমন বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ার কোনও জায়গা ছিল না। নতুন এই প্রমাণ সেই ছবিটাই বদলে দিতে পারে।
মার্কিন বিজ্ঞানী ব্রিনয় হোরগ্যান বলছেন, “কক্ষপথ থেকেও মঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় আমরা এই ধরনের পাথর দেখেছি। এত জল ছাড়া এই শিলা তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। সম্ভবত, এটাই প্রাচীন উষ্ণ ও ভেজা মঙ্গলের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ।”
প্রিজ়ারভেন্স রোভার যে কেওলিনাইট দেখেছে, সেগুলি শুধু ছোট টুকরো নয়—কিছু জায়গায় বড় সাদা বোল্ডারও রয়েছে। পৃথিবীর কেওলিনাইটের সঙ্গে তুলনা করে এই পাথরগুলি পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে বোঝা যায় কী ভাবে মঙ্গলের আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল সময়ের সঙ্গে বদলে গেল।
এই পাথরগুলির উৎস এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ২০২১ সালে রোভার মঙ্গলের জেজ়েরো গর্তে নামার পর থেকেই এগুলির দেখা মিলছে। ধারণা করা হয়, সেখানে একসময় বিশাল হ্রদ ছিল। তবে কেওলিনাইট ঠিক সেখানেই তৈরি হয়েছিল, নাকি অন্য কোথাও তৈরি হয়ে এখানে এসে জমেছে—তা এখনও রহস্য।
একটা বিষয় অবশ্য পরিষ্কার—মঙ্গল শুধু রুক্ষ আর শুষ্ক ছিল না। তার ইতিহাসে হয়তো ছিল বৃষ্টি, উষ্ণতা আর জলভরা এক সম্পূর্ণ আলাদা অধ্যায়, যার গল্প এখন ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে সাদা পাথরের সূত্র ধরে।
‘স্পিরিট’-এ প্রভাসের ১৬০ কোটি! নায়িকাদের পারিশ্রমিকের ফারাক ঘিরে নতুন চর্চা