পশ্চিম এশিয়ার এক সময়ের ‘সম্রাট’ আজ অস্তাচলে
পশ্চিম এশিয়ার ইতিহাসে ইরাক এক সময় ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী দেশ। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর তীরে জন্ম নেওয়া এই দেশ একসময় পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ সেই ইরাক যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা এক সময়ে কল্পনাও করা যেত না। একদা পশ্চিম এশিয়ার এই ‘সম্রাট’ আজ আর শক্তির ভারসাম্যে কোনও গুরুত্ব রাখে না।
এক সময়ের শক্তির কেন্দ্র
ইরাকের উত্থান এবং পতনের ইতিহাস আসলে এক দীর্ঘ ও করুণ যাত্রার কাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ইরাক ছিল পশ্চিম এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ। বাগদাদের সামরিক ক্ষমতাও সম্মানিত ছিল, এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও তাকে সম্মান দিয়ে চলত। কিন্তু, ২০০০ সালের পর থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং পরপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে ইরাক ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারাতে থাকে।
মেসোপটেমিয়ার ঐতিহ্য ও তার পতন
ইরাক একসময় মেসোপটেমিয়া সভ্যতার চারণভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে গড়ে ওঠেছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা, যেখানে বাণিজ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাগদাদ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী শহর। তখন ইরাকের রাজধানী ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, যেখানে নানা জাতি এবং সংস্কৃতির মিলনস্থল ছিল। তবে, ধীরে ধীরে ধর্মীয় বিভাজন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদে আক্রান্ত হয়ে ইরাক তার এই শক্তি হারায়।

অটোমান শাসন ও ইংরেজি দখল
১৬শ শতাব্দীতে ইরাক অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে পড়ে, যা তার স্বাধীনতা এবং শক্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দেয়। ১৯১৪-১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হলে বাগদাদ ব্রিটেনের কব্জায় চলে যায়। তারপর ১৯২১ সালে ব্রিটেন ইরাককে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু তারা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখে।
স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সাদ্দাম হুসেনের উত্থান
১৯৩২ সালে ইরাক ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা চলতে থাকে। ১৯৬২ সালে বাগদাদের রাজতন্ত্র উৎখাত করা হয়, এবং সাদ্দাম হুসেনের আমলে ইরাক কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে পায়। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাদ্দাম দেশের রাজনীতিতে শৃঙ্খলা আনেন, তবে তার একনায়ক শাসন এবং বিরোধীদের প্রতি নির্মম আচরণ তাকে অমর করে রেখেছে। ১৯৮০ সালে ইরানとの রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরাক প্রবাহিত হয়, যা দেশটির অর্থনীতির মারাত্মক ক্ষতি করে।
আন্তর্জাতিক যুদ্ধ এবং আমেরিকার আগমন
১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণ করে সাদ্দাম। তবে, আমেরিকা এবং মিত্র বাহিনী তাতে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৯১ সালের ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম’ নামক অভিযান চলাকালীন সাদ্দাম কুয়েত থেকে তার সেনা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এরপর ২০০৩ সালে আমেরিকা ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির অভিযোগে আক্রমণ করে। মাত্র ২০ দিনের মধ্যে ইরাকের অধিকাংশ শহর অতিক্রম করে মিত্র বাহিনী, এবং সাদ্দাম ধরা পড়ে। ২০০৬ সালে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
ইরাকের পতনের পর পশ্চিম এশিয়ার নতুন শক্তি
সাদ্দামের মৃত্যুর পর ইরাক আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দেশটি আর কখনই পূর্বের শক্তি ফিরে পায়নি। বর্তমানে, পশ্চিম এশিয়ার শক্তির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। এই দেশগুলো ধনী, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ইরাকের পতনের পর কাতার, সৌদি আরব এবং আমিরশাহির মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।
তুরস্কের নতুন উত্থান
অন্যদিকে, তুরস্কও গত কয়েক বছরে পশ্চিম এশিয়ায় শক্তির পরিসরে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এর্দোগান বর্তমানে তুরস্কের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করেছেন, এবং তাদের অস্ত্র রফতানি ১১ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তুরস্ক যদি অতীতের অটোমান সাম্রাজ্যের মতো একটি বড় ভূমিকা নিতে সফল হয়, তবে এটি পুরো পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতিকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে।
উপসংহার
ইরাকের এক সময়ের সম্রাট থেকে আজকের অস্তাচলে পতিত দেশ—এটি একটি করুণ ইতিহাস। এক সময়ের শক্তিশালী ইরাক আজ পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। তবে, তার পতনের পর অন্য দেশগুলো তার শূন্যস্থান পূরণ করেছে, এবং এখন এই অঞ্চলে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, এবং তুরস্কের মতো দেশগুলো নতুন শক্তি হিসেবে উদ্ভাসিত হচ্ছে।
যৌন ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে কফি! কীভাবে প্রভাব ফেলে প্রজননে, ব্যাখ্যা করলেন চিকিৎসকেরা