মুখোমুখি যুদ্ধে কতটা টিকতে পারবে ভেনেজ়ুয়েলা?
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো–কে সামরিক অভিযানে আটক করে দেশছাড়া করার পর থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছে কারাকাস, আর পাল্টা অভিযোগ তুলেছে— তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নিতেই এই অভিযান। এমন উত্তেজনার আবহে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গড়ায়, তা হলে ভেনেজ়ুয়েলা কতটা লড়তে পারবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র–এর বিরুদ্ধে?
ভেনেজ়ুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর নাম ‘ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস’। মূলত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতি বজায় রাখাই ছিল এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য। শক্তির বিচারে আন্তর্জাতিক সূচক ‘গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স’-এ ভেনেজ়ুয়েলার অবস্থান প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতোই এক নম্বরে।
মানবসম্পদের দিক থেকে তুলনা করলেই ফারাক স্পষ্ট। ভেনেজ়ুয়েলার সক্রিয় সেনা প্রায় ১ লক্ষ ৯ হাজার। রিজ়ার্ভ সেনা আট হাজারের মতো। এর বাইরে আধাসামরিক বাহিনী রয়েছে আনুমানিক ২ লক্ষ ২০ হাজার। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সেনা ১৩ লক্ষের বেশি, রিজ়ার্ভে আরও প্রায় ৮ লক্ষ। প্রশিক্ষণ, যুদ্ধঅভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে মার্কিন বাহিনী বহু গুণ এগিয়ে।
আকাশপথে শক্তির ব্যবধান আরও প্রকট। ভেনেজ়ুয়েলার বিমানবাহিনীতে রয়েছে প্রায় ২৩০টি বিমান— যার বড় অংশই পুরনো প্রজন্মের, রাশিয়ার তৈরি সু-৩০ এমকে২-এর মতো। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ১৩ হাজারের বেশি যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে এফ-২২ ও এফ-৩৫-এর মতো স্টেলথ জেট রয়েছে। আধুনিক রাডার, স্যাটেলাইট নজরদারি ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আমেরিকা কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
স্থলযুদ্ধেও একই ছবি। ভেনেজ়ুয়েলার হাতে আনুমানিক ১৭০টি ট্যাঙ্ক ও ৮,৮০০ সাঁজোয়া যান রয়েছে— যেগুলির বেশির ভাগই আধুনিক মানদণ্ডে পুরনো। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ট্যাঙ্ক রয়েছে ৪,৬০০-র বেশি, সাঁজোয়া যান প্রায় ৪ লক্ষ। প্রযুক্তি ও রসদের জোগান— দুই ক্ষেত্রেই ফারাক বিশাল।
নৌবাহিনীতে ভেনেজ়ুয়েলার সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট। ছোট যুদ্ধজাহাজ ও উপকূলরক্ষী জাহাজ থাকলেও কোনও পরমাণু রণতরী নেই। একটি মাত্র ডুবোজাহাজ দিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে তুলনা চলে না— যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে ৭০টি আধুনিক ডুবোজাহাজ, ৪০০-র বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং ১১টি পরমাণু শক্তিচালিত এয়ারক্রাফ্ট ক্যারিয়ার।
সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে বাজেট। ভেনেজ়ুয়েলার বার্ষিক প্রতিরক্ষা ব্যয় আনুমানিক ৪–৫ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে বছরে খরচ করে প্রায় ৮৯৫ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভেনেজ়ুয়েলার সামরিক আধুনিকীকরণকে কার্যত থামিয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে ভেনেজ়ুয়েলার পক্ষে দীর্ঘদিন টিকে থাকা কঠিন। সর্বোচ্চ যা সম্ভব, তা হল স্থানীয় প্রতিরোধ ও গেরিলা কৌশলে সময় কেনা। কিন্তু প্রযুক্তি, অর্থ ও বৈশ্বিক প্রভাব— সব দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্ব এতটাই স্পষ্ট যে শক্তির পাল্লা একতরফাই থাকবে বলেই মত বিশ্লেষকদের।