মধ্যপ্রদেশের ছয় মহিলা বিচারকের বরখাস্তের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্ট তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ, অন্য বিচারকদের তুলনায় কম সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করার কারণে তাঁদের বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এর পেছনে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছে, “যদি পুরুষদের ঋতুস্রাব হতো, তবে হয়তো এ ধরনের পরিস্থিতি বুঝতে পারতেন।”
মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের সিদ্ধান্ত
মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এই মামলায় গত সেপ্টেম্বরে চার বিচারককে পুনর্বহাল করা হয়। তবে বিচারক অদিতি শর্মা ও সরিতা চৌধরির বিষয়ে মামলাটি বিচারপতি বিভি নাগারত্ন এবং বিচারপতি এন কোটেশ্বর সিংহের বেঞ্চে উঠলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পায়। জানা যায়, শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার সময় বরখাস্ত করা হয়েছিল এই দুই বিচারককে।
গর্ভপাতের পরও বরখাস্ত
মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট সুপ্রিম কোর্টে মুখবন্ধ খামে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, বিচারক শর্মা এবং চৌধরিকে কেন সরানো হয়েছিল। সেখানে প্রকাশ পায়, বরখাস্তের আগে বিচারক শর্মার গর্ভপাত হয়েছিল। তিনি শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। এর পরও তাঁকে “মন্থর” বলে অভিযোগ তুলে বরখাস্ত করা হয়। বিচারপতি নাগারত্ন এ প্রসঙ্গে বলেন, “কোনও মহিলা বিচারক যদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় থাকেন, তাঁকে ধীরগতির বলে বরখাস্ত করা অন্যায়।”
মামলার নিষ্পত্তি নিয়ে অভিযোগ
হাই কোর্ট জানিয়েছিল, ২০২২ সালে বিচারক শর্মার কাছে প্রায় ১৫০০ মামলার ফাইল ছিল, যার মধ্যে তিনি মাত্র ২০০টি নিষ্পত্তি করেন। এর কারণ হিসেবে বিচারক শর্মা জানান, শারীরিক অসুস্থতা এবং ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে কাজের গতি ধীর হয়ে গিয়েছিল। তাঁর গর্ভপাত এবং ভাইয়ের ক্যানসার ধরা পড়া এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিচারপতি নাগারত্ন এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “এই নিয়ম পুরুষ বিচারক এবং আধিকারিকদের জন্যও প্রযোজ্য করুন। দেখা যাক, তখন কে কোথায় দাঁড়ান।” সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, কাজের মান বিচারে শারীরিক এবং মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।
কাজের মান নির্ধারণে পক্ষপাতের প্রশ্ন
বিচারক শর্মার হয়ে সওয়ালকারী আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিংহ জানান, তাঁর মক্কেলের কাজের রেকর্ড অনবদ্য। কিন্তু পেশাগত জায়গায় প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। ইন্দিরার দাবি, “নারী বিচারকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণ করা হয়েছে।” সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তোলে, জেলা এবং দায়রা আদালতের বিচারকদের কাজের ‘টার্গেট’ নির্ধারণের পদ্ধতি কতটা ন্যায্য।
পরবর্তী পদক্ষেপ
সুপ্রিম কোর্ট আগামী ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দুই বিচারককে বরখাস্তের কারণ ও তার ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব
এই ঘটনাটি বিচার ব্যবস্থায় নারীদের প্রতি মানসিকতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট করে দেয় যে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে হেয় করে দেখা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিচারপতি নাগারত্নর মন্তব্য, “মহিলা বিচারকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজের নৈতিকতার অভাবকে স্পষ্ট করে।”
এটি কেবল একজন বিচারকের নয়, বরং সমগ্র নারী সমাজের প্রতি মনোভাব নিয়ে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে।