ভিসা-কূটনীতিতে নতুন টানাপড়েন!
ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রভাব এ বার সরাসরি পড়ল ভিসা পরিষেবা ব্যবস্থায়। রাতারাতি ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের তিনটি ভিসা পরিষেবা কেন্দ্র সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে নয়াদিল্লি, তার পরে শিলিগুড়ি এবং সর্বশেষ আগরতলায় বাংলাদেশের ভিসা ও কনসুলার পরিষেবা অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে স্বাভাবিক ভাবেই ভিসা আবেদনকারী ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার থেকে আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনের অধীন ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু ভিসা নয়, সমস্ত ধরনের কনসুলার পরিষেবাও আপাতত বন্ধ থাকবে বলে জানানো হয়েছে। সোমবার রাতে প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, “অনিবার্য কারণেই” এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এই পরিষেবা বন্ধ করা হল, সে বিষয়ে ঢাকার তরফে কোনও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। একই ভাবে দিল্লি এবং শিলিগুড়ির ক্ষেত্রেও কোনও নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, কলকাতায় বাংলাদেশের উপহাইকমিশনের ভিসা পরিষেবা এখনও স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নির্দিষ্ট কয়েকটি শহরকেই কেন এই সিদ্ধান্তের আওতায় আনা হল। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনারই প্রতিফলন।
সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বেশ কিছু সংবেদনশীল ঘটনার জেরে চাপে রয়েছে। তার আগে নয়াদিল্লি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ঢাকায় ভারতীয় ভিসা আবেদনকেন্দ্র সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরে বাংলাদেশের রাজশাহী, খুলনা এবং চট্টগ্রামেও ভারতীয় ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখা হয়। বিশেষ করে চট্টগ্রামে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ, ইট ছোড়ার অভিযোগ এবং উত্তেজনার আবহ তৈরি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পরে পরিস্থিতি আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। সেই সময় ভারতের বিভিন্ন কূটনৈতিক দফতর ঘেরাওয়ের ডাক দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কূটনৈতিক দফতর ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিসা পরিষেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
অন্য দিকে, দিল্লিতেও বাংলাদেশের হাইকমিশনের সামনে সম্প্রতি বিক্ষোভ হয়েছে। ভারত সরকারের অভিযোগ, বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যম ওই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত ভাবে তুলে ধরেছে। এই প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বিক্ষোভ হলেও কেউ বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভবনের ভিতরে ঢোকেনি। তবু ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কূটনৈতিক উত্তেজনা বজায় রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে, দাবি করেছে যে ভারত এই পরিস্থিতিকে “সরলীকরণ” করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, ভিসা ও কনসুলার পরিষেবা ঘিরে যে সিদ্ধান্তগুলি নেওয়া হচ্ছে, তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাস্তব জটিলতাকে আড়াল করছে।
সব মিলিয়ে, দিল্লি, শিলিগুড়ি ও আগরতলায় বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র বন্ধ হওয়া শুধু প্রশাসনিক ঘটনা নয়, বরং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েনেরই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কবে আবার এই পরিষেবা স্বাভাবিক হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে দুই দেশই, কারণ ভিসা পরিষেবা বন্ধ থাকার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের যাতায়াত, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পারিবারিক যোগাযোগের উপর।